উড়োচিঠি
উড়োচিঠি - ১
তোমাকে ভুলতেই হবে ভেবে ভেবে আমিও এক ক্যান্ডিয়া জাহাজে যাত্রী হয়ে ভেসে যাবো বলে জলরাশির দিগন্ত রেখায় খুঁজেছি চিমনি।
ওদিকে ফাঁকা রাস্তায় পাতারা নির্বিঘ্নে রাস্তা পেরোয় হাওয়ার হাত ধরে। আকাশে জটিল জ্যামিতি এঁকে চলে আকাশযান।
এদিকে বারবার মনে পড়েই যায় সেই ফাঁটা ঠোঁটের আদর। খেলনা রেলগাড়ীর হুইসেলের মত প্রচন্ড প্রশ্বাস। ডায়াফ্রামের উন্মাতাল উত্থান-পতন।
প্রেম মোমের মত, একবার জ্বলেই শেষ হয়ে যায় না তো।
উড়োচিঠি - ২
তোমার মাথা আমার কাঁধেই হেলুক শুধু, তেমনি আমারটাও। বুকে কান পেতে শুনবো ঢিপঢিব শব্দের ছন্দে অনুক্ততার গান, মুখ গুজে চুপি দেবো স্বর্গের জানালায়। জড়িয়ে ধরে মৃদু উষ্ণতায় হবো সতেজ, ট্রেনের চলার ছন্দে মাতাবো শরীর। আমরা পরস্পরের চোখে দেখবো মুগ্ধতার বিস্ময়, ডুবে থাকবো মোহনীয়তায় শিখে নিয়ে সূর্যমুখীর ধ্যান। ক্রমশ বর্তমান ও ভবিষ্যতের মূহুর্তরা অতীতে জমবে জীবন চক্রের আবর্তনে। তারওপর ফের পরস্পরের নিঃশ্বাসে ভেসে যাবো দুজন জন্মান্তরে।
উড়োচিঠি - ৩
তোমার বাড়ির পাশের বাস্তায় ল্যাম্প পোস্ট, মিউনিসিপ্যালিটির কল, ডাক বাক্স, চায়ের স্টল সবার সাথেই আমার নিবিড় সম্পর্ক। রাস্তার ধারে ফলজ, বনজ আর ঔষধি গাছের সংখ্যা জানি। চিনি ফোটা ফুলের ঘ্রাণ।
শুধু কি তাই! তোমার ভেন্টিলেটরে জোর করে বাসা গেড়ে বসা চড়ুই এর বৃত্তান্ত জানি। জানি আমার ঈর্ষা জাগিয়ে তোমার বসার ঘর ঢুকে পড়া হকার আর পত্রিকা-ম্যাগাজিনের নাম। মুখস্থ দরজা-জানালার পর্দার রঙের মত তোমার রুটিন। তোমার পছন্দ-অপছন্দের তালিকা মুঠোয় পুরে গিলেছি জ্বরের অষুধের মত কবেই। চিনছি একটু একটু করে মনের জ্যামাতিক অলিগলি।
আমার এত্তসব চেনাজানা আর জানাশোনায় কিচ্ছুটি হচ্ছে না তবু। তুমিই শুধু কেমন কুয়াশা মোড়া, ধোঁয়াটে সন্ধ্যাের মত, গলতে চেয়েও না-গলা বরফের মত!
উড়োচিঠি - ৪
জেনে রাখো প্রিয়, আমার চোখের চেয়ে মুগ্ধতা আর কারো চোখেই পাবে না যেন। আর কারো চোখেই উৎসবের আমেজে করবে না আনন্দের অশ্রুতে এতো ঝিকমিক। তার চারপাশে না-কি এমনিতেই ময়না-ফিঙে নাচে, পায়ের কাছে জড়ো করে এটা-ওটা। সে-চোখের সামনে তুমি আর্তের মতন বসে থাকবে কাক হয়ে তবু ক্ষণে ক্ষণে সে চোখ বাড়াবে কোকিলের দিকে। তোমার ও চোখ ভিজবে-শুকাবে, তার চোখ শীতল। সে জানে, এমনি চোখেই ঘায়েল হবে পাখপাখালি। দুমড়ে মুচড়ে যাবে সংশ্লিষ্ট আরও কেউ। তার গলার মালায় নেতিয়ে পড়া অনেক ফুলের সাথে বাঁধা পারবে বৃন্তচ্যুত আরও একটা ফুল। মগজে একটা রাক্ষস জিইয়ে রেখে লোলুপ হাসির আভা লেপ্টে থাকবে অনিন্দ মোহনীয়তার প্রলেপে। সেই আবেশে আত্মাহুতিতেও কার্পণ্য করবে না কত কেউ। ওদিকে বঞ্চিতের হাহাকারে মেঘ জমবে আকাশে আর সে ছায়ায় দিব্বি চলবে তার জীবন, অতিবেগুনী রশ্মি ছুঁতেও পাবে না তাকে।
প্রিয়, জীবনের মহত্ম জিইয়ে রেখো। জানোতো, স্বর্গীয় উদ্যানের ফুলের মত টবে বেড়ে ওঠা ফুলেও বিমোহিত করার মত কমবেশি গন্ধ থাকে। একটু পরিচর্যা করলে মৌ মৌ করবে চারপাশ। স্বর্গ নামবে ধরাধামে।
উড়োচিঠি - ৫
একদিন, দু'দিন, তিনদিন করে করে আরো কিছুদিন পর ফের ফাগুন আসবে দেখো। তখন এমন করে রাঙবো দুজন- সে রঙ আর ফিকে হতে দেবোই না জেনো। আঙুলের ফাঁকে গুঁজে দেব জোড়ালো আঙুল। সমাজের বাঁকা হাসি, পরিবার-পরিজনের আগুনে কি ভেজা চোখ দেখবোই না যেন! কেননা হিসেব শেষে সবাই সার্থপরতায় দুষ্ট।
তাদের মর্জির কাছে চোখ নামিয়ে থেকে থেকেই আমরা হারিয়েছি কত মাহেন্দ্রক্ষণের হাতছানি দেয়া সময়; আমরা একসাথে জৈষ্ঠের সূর্যদয় দেখতে পারিনি, শরৎতের শিশির মাড়াইনি, মাঘের কুয়াশায় মাখিনি, ভিজিনি ভরা শ্রাবণে, জাগিনি রাত ভরা-পূর্ণিমায়, গোনা হয়নি তারা, দেখা হয়নি উল্কাপাত, হয়নি সমুদ্রস্নান, হয়না মুখে আদরে মাখানো ভাত বিনিময়, আরও আরও কতকিছু!
তারপরও তো বুঝি থাকে ঢের। তীর্থ যাত্রার আনন্দ নিয়ে ছুটে আসি রাত-বিরেতে আমরা পরস্পরের শহরে ছুুঁতে মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রাণে প্রাণ মিশিয়ে ফের ফিরে ফিরে আসা-যাওয়ায় শহরের ব্যস্ততায় মিলিয়ে যেতে থাকি পরস্পর থেকে, চোখ জ্বলে যায় রোদে তবু দেখা যায়নাকো। অসংখ্য স্থির আর চলন্ত ছবি চোখের পাতার ওঠা-নামায় স্ক্রল হয় কেবল। ঘুরেফিরে এমনি নিপুণ প্রেম-বিরহে কাটে একদিন, দু'দিন, তিনদিন করে করে কেটে যায় জন্মের সাথে বরাদ্দ পাওয়া সময়।
উড়োচিঠি - ৬
আমিও তোমার মতো অসুখ কিনবো ভাবছি। সবকিছুতে বিষাদের ঝাঁঝালো স্বাদ চোখ-নাক ভিজিয়ে দিচ্ছে বড়। আবেগী চুম্বনেরা পরে থাক ঝরে পড়া চুলের মতো। ভূতের কিলে একটু পোক্ত করতে চাই শরীর-মন। অনুভূতির মরচে, আদ্র পলেস্তেরা, আঠা কি পেরেক সব ঝালিয়ে নেবো নাহয় বেশ করে। সহনশীলতা আর স্থায়ীত্বের আদর্শ মাপকাঠি ছুঁয়েই ফের ফিরবো তোমার আলিঙ্গনে। তাই আমিও অজানা মোহে ছুটে যেতে চাই এদিক-সেদিক। অকারণ আয়েশে কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতে চাই কারো মুখোমুখি। অযাচিত ইচ্ছেয় নিতে চাই ক্ষানিক স্পর্শ।
আমিতো ফিকে করেছি সব অনায়াসে। তুমি কেনো ভোলো না সহজে! আমার জীবন গোছানো কি এলোমেলো করে দেবার অধিকার তোমারই ছিলো। শেষে বেশতো টানিয়েছো অ্যাবস্ট্রাক্ট ব্যাকড্রপ তোমার-আমার আনন্দ মঞ্চে। ভাবছি- এবার নিজের হাতেই তুলে নেব শাসন দণ্ড।
উড়োচিঠি - ৭
বড় গাছের পাতাদের মত রোদ ছিনিয়ে নিচ্ছে কিছু বা কেউ। আমি যেন হাওয়ার ভাসতে ভাসতে ভূমি ছোঁয়া পাতার মতোন, দমকা হাওয়ায় উড়ে জলে বিসর্জিত শিমুল তুলোর মতোন। তুমি কি না ভাবো ধূলো ঝড়ে চোখে পড়া বালুকণা!
এমন করে আক্রান্ত হয়ো না প্রিয় যা আমি জনিত ব্যথাকে ভুলিয়ে দেয়, ফিকে করে দেয় আমার অস্তিত্ব। তুমিহীন আমার যে পরাগায়ন বিমুখ সূর্যমুখীর একগুঁয়েমির জীবন গোলক গ্রহে একদিন ঘড়ির কাঁটায় চেপে যদি বাঁক নেয় ১৮০°, তবে হয়তো ভীষণ অভিমানে আমিও খুঁজে নেব বিকল্প সুন্দর। ততোদিনে যদি যায়ও যুগ তখন তোমার পেরিয়ে যাওয়া তারুণ্য মন ভরাতে অক্ষম দীপ্ত চতুরের।
আমি কিন্তু তখনো প্রকট জীনে বহন করবো পূর্বসূরীদের তেজ দীপ্ত জ্যোতি যা অক্ষম প্রতিবেশে স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপেছে গ্রহণের কবলে।
এতো খোলামেলা মনে তবুও যা গোপন, বেলা শেষে স্বজন ও দুর্জনেরা জেনে যাবে ঠিক কে কাকে ঠকিয়েছিলাম কতটা। চোখের জলে উপচে পড়া বিলে হাঁসের মতন পৌনঃপুনিক মুখ ডুবিয়ে স্বস্তি খুঁজি তবু। রাত-বিরেতে একটা ডাহুক কেঁদে উঠে কেবল। বহুদূরে যেন প্রতিত্তোর হয়! কখনো আবছা বুঝি, কখনো বুঝিও না। হায়, পেয়ে গেলে বুঝি কমে যায় আকর্ষণ! পেয়ে গেলে কেন যে বেড়ে যায় অবহেলা! পেয়েও হারালে জীবন কেন যে হয় এত এলোমেলো!
উড়োচিঠি - ৮
কি ভাবো? খুব জিতে গেছো আর ভীষণ হেরে গেছি আমি?
এখন আমার প্রায়ই শিশিরের মতো চুমু পড়ে সর্বাঙ্গে আর আমি ধুয়ে ধুয়ে সজীব হয়ে উঠি আরো। শুভ্র কুয়াশার রাতে ভুলে কাপড় মেলে রাখার মত ফেলে রাখিনা শরীর ভিজিয়ে দেবার জন্যে। পরম মমতায় একজন বুকে জাপটে নিয়ে যায় স্নিগ্ধ শীৎকারে। কনকনে হাওয়ায় জড়িয়ে ধরার বাহানা করতে হয় না। তার আগেই আদরের ধবধবে পশমি চাদরে মুড়ে যাই। বৃষ্টিতে একছাতায় জোর করে ঘেঁষতে হয়ই না। কেউ নিজে ভিজে বৃষ্টিকে ছুঁতেই দেয় না আমায়। প্রচণ্ড গরমে প্ররোচিত করে না অর্ধনগ্ন হতে। কখনো বানানো হাত পাখায়, কখনো কথার তোড়ে দখিণা হাওয়া বইয়ে দেয়।
ফেলে রাখা হাতে এখন রাখতে দিই না প্রবঞ্চক হাত। স্নেহের আঙুলে একজন পূর্ণ করে অপূর্ণতার ফাঁক। প্রতারণার স্বপ্নে আঁকি না ভবিষ্যৎ। এখন প্রতিটি দিনই স্বপ্নের অধিক। পেটের পটে ভ্রুণ হত্যার আঁচড় কাটতে হয় না। একজন আমাকেই নিয়ে আগামী শিশুর স্বপ্ন বোনে।
কী ভাবো? খুব জিতে গেছো তুমি আর আমি ভীষণ রকম হেরে গেছি? তোমার জন্যে একদলা থুতু ফেলে একজনের ঠোঁটে-মুখে চুমুতে ভাসাই, ভালোবাসার বানে ভাসি তুমুল।
লেবেলসমূহ: উড়োচিঠি















