বিরহের কবিতা - ২
১.
বান্ধই
আইজ কাইল সারাদিন আমার ঘুম পায়
তবুও ঘুম আসে না রে বান্ধই
ছুডু ছুডু খোয়াবে ভইরা থাকে দুইচোখ
পুরাণা দিনের স্মৃতির ছন্দে-গন্ধে অনাগত দিনের
গোপন খুনসুটি মিইশা হেই এক রাজভোগ যেন!
খোয়াবের রাজ্যে অহন আমি নিত্য বাসিন্দা।
তাও আমার ভাল্ লাগে!
অজানা এক তৃপ্তিতে জুরাইয়া যায় শইল-মন
আমি সুখের আনন্দে চিল্লান দিয়া উঠি
চোক্ষে ভাসে ঝিলমিইল্লা কতো বাতি
হুশ থাকে না গো আমার
সব ঢাইলা দিতে মন চায়!
আবার খারাপও লাগে!
বুকের ভিতরে আউলা বাতাস ঘুরতে ঘুরতে
আষাঢ় মাসের বান ডাকে
আমারে খালি ভাসাইয়া লইয়া যায়
আর নিঃস্ব বানাইয়া দেয়
অস্থির লাগে আমার!
আমার খুব ঘুমাইতে মন চায়
তবু ঘুম আসে না গো।
বেহেই কয়, আমি বেধুম ঘুমাই
তুমিও তাই শুইনা হয়ত মনে মনে গাইল পারো!
আমি কি আর ঘুমাইরে বান্ধই
চোখ বুঁইজা পইড়া থাকি কেবল।
২.
পণ
ওপারে তুই বেঁধেছিস ঘর
ঢেলে দিয়ে স্বপ্ন ঝুড়ি,
সময় কাটে নিথর আমার
সুখ যে সুতো কাটা ঘুড়ি।
মাঝখানে তরল আগুন
পেড়ুই নিয়ে ফুটো নৌকো,
ড্যাম সিগারেটে মুখ কাহিল
টানের পর টান তবু শেষ হয় নাকো।
ভুলতে চাই, পাষাণ তোকে ভুলতে চাই
তাই পেড়িয়েছি সাতটা সাগর
বুকে চেপে অনেক পাথর
চতুর প্রিয়, তোকে ভুলতে চাই।
হঠাৎ হঠাৎ তবু মন কেমন কেমন!
আজও বুঝি তোকে চাই ভীষণ।
এই-যা! কি বলছি ধুর ছাই!
চতুর-পাষাণ, তোকে ভুলতেই চাই।
৩.
সাম্প্রতিক
ড্রোনের চোখে তাকানোই যায় না
পার্শ্ববর্তী দেশগুলো খোঁজা শেষ,
অবিরাম খুঁজে হয়রান
প্রিয় তুমিটা নিরুদ্দেশ!
বিষিয়ে বায়ু, পুড়িয়ে সবুজ
কালোয় ঢাকে কত রঙ,
প্রজাপতি উড়ে নাচে দেখি
দোয়েলের কন্ঠেও সরকারি ঢঙ।
আমারও বিচ্ছিরি লাগে রাতদিন
বুঝি চরম নিয়তি এই,
জীবন বিষাদের কফি মগে
তুমি নামক মিষ্টিটা নেই।
৪.
বাস্তবতা
আপাত নিখাদ অভিনয়ে পেড়ুলো তো অনেকটা সময়
এখন সহজাত ইচ্ছের মতোই যাপিত জীবন
তোমার জন্য দুঃখবোধ এখন শূণ্যের ঘরে
বরং কবিতার শরীর হয়ে উঠতে পারতো
এমন বিস্মৃত অগ্রন্থিত শব্দগুচ্ছরা
সেদিনের চেয়ে হাহাকার জাগায় বড়।
এখন কোন্ আকাশে জ্বলজ্বল হয়ে ঝুলে থাকো
কোন্ বাতাসে ওড়াও মন
কোন্ ঢেউয়ে ভাসাও শরীর
কার সঙ্গে ভাগ করে আনবে আগামী
এইসব গোপন জিজ্ঞাসারা উকি মারে না।
কাটুক সময় তোমার ইচ্ছে মতো।
বেহিসেবি মন হঠাৎ যখন হিসেবি হয় জাগতিক মোহে
ডেবিট-ক্রেডিট-ব্যালেন্স নির্ভুল হওয়াই সঙ্গত
আর আমি হিসেব নিকেষের কানে তুড়ি মেরে
দিব্বি আছি আমার মতো
এখন আর মনে না করিয়ে দিলে
তোমার অস্তিত্ব মনেও আসে না প্রিয়!
৫.
বেদনার রুপ
সমৃদ্ধ ফোনবুক ভরে আছে নাম্বারে
অপারেটরের ক্ষুদে বার্তায় উপচে থাকে
প্রেরিত বার্তার ঘর করে উপহাস;
আমার আলসেমী এখন এমনি।
আমাকে নাকি খুঁজেই পাওয়া যায় না!
লোকমুখে জেনেছো নিশ্চই?
তাই নাড়োনি বুঝি আঙ্গুল
অথচ যোগাযোগ নেই কতোদিন!
যদিও কথাতো এমনি ছিলো হে সুন্দর
সব মোহ ছেড়ে
বৃক্ষের মতো আমার ইন্দ্রীয় কেবল
তোমার সংকেতের অপেক্ষায় ধ্যানমগ্ন থাকবে
ঘড়ি, ক্যালেন্ডার হিসেব না করে!
জমকালো স্মৃতিতে ঘেরা জীবন
এমনি দীর্ঘ যোগাযোগহীনতায়
কি এসে গেছে আমাদের!
তুমি কি আর জানো প্রিয়
আমার বেদনাও কতো সুন্দর!
৬.
ইকারাস
ইথারে এতো যে কথা ভাসিয়ে দিই
শুনতে কি পাও তুমি?
মনের কানে ধরা দেয় কি তার কিছু?
হলে ভালো, না হলেও কার বা কি ক্ষতি!
উড়ে যাওয়া শিমুল তুলো আর
কার মাথায় বসতে পারে
ঝরা পাতার শব্দের মতো
শিশির বিন্দু পতনের মত
হৃদয়ের ক্ষরণে শব্দের জন্ম হয়
মনের আকুতি ভেসে যায় কেবল
শোনো কি?
আমি বুঝি তারার থেকেও দূরের মানুষ?
আমার দহন বুঝতে তোমার
জন্ম-জন্মান্তর কেটে যাচ্ছে!
আমি বুঝি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কেউ?
৭.
আশাবাদ
হয়তো ফিরবে না
তারপরও যদি ফেরো!
যতই উদ্ধত থাক নাগ-নাগিনীর ফনা
যতই ব্যারিকেডের স্তূপ পড়ুক
গনতন্ত্রের মুখোস আটা চলমান
স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার যুগেও
যেমন সাম্যবাদের স্বপ্ন লালন করি
তেমনি কল্পনার বিলাসিতা আবারও
বারবার নিজেকে বোঝ মানানো
যদিই ফেরো!
হয়তো ফিরবেই না
তারপরও যদিই ফেরো!
৮.
আবার মুখোমুখি
এক কোটি বছর কি হয়ে গেছে-
আমাদের যোগাযোগ নেই!
ঘূর্ণন সূত্রের দীর্ঘ সমীকরণে
শনি-বৃহস্পতির অক্ষমতা-সক্ষমতায়
কালই হয়তো মুখোমুখি এক মঞ্চে।
জোর করেই মন পাখিকে
যেসব বুলি পড়ালে এতকাল
রপ্ত হয়েছে তো?
নতুন আকিকায় ভুলেছে তো গোপন নাম?
লকারে জমা রাখা মূ্ল্যবান অলংকার
গিলেছে তো পুরোনো সব প্রতিজ্ঞা?
জীবনে কত ভাবেই বেঁচে থাকা যায়!
ভাবনার শিমুল তুলোরা ভাসতে ভাসতে
সবে উড়োউড়ির বিজ্ঞান বুঝতে চেয়েছিল
আর অমনি কালো মেঘের ঝুম বৃষ্টি
জল গড়ালো কেবল আমাদের দু’ভাগ করে।
ভাবনার পতন হলেও এখনও কী সুন্দর!
আজকের দিন পরই হয়তো মুখোমুখি
তুমি-আমি মুদ্রার মতো দুই রুপ নিয়ে;
সে অব্দি পৃথিবী বেঁচে থাক।
৯.
তুমি-আমি ও কবিতা
অন্তত একটি কবিতার সুবাদে
আপাত অমরত্ব পেয়ে যাবো দেখো।
তোমার নিতান্তই অযোগ্য হয়েও
একদিন জ্বলজ্বল করবো তোমার চেয়ে।
একান্তই তোমার জন্যে লেখা পঙক্তিরা যখন
নানান কন্ঠে উচ্চারিত হবে প্রেমাস্পদের বন্দনায়
তুমি কান চেপে ধরলেও জাগবে মনে
মন থেকে মুছতে চাইলে বাজবে কানে
নিরুপায় অস্বস্তিতে ভুগবেই ভীষণ
অপ্রতিরোধ্য আমার কথার আবর্তনে!
অসঙ্গত চাওয়া পাওয়ার এ জীবনে
অন্তত একটি কবিতার জন্ম ও দীর্ঘায়ু
নিশ্চিত করেই জীবন ছাড়বো জেনো।
১০.
আকুতি
যেন নিশীথ হীম-কুয়াশায় বিজন গাছে
বাদুরের মতো আছি ঘাপটি মেরে
তবু মনের ভেতর শীতনিদ্রা ভুলে
ডেকে ওঠে বর্ণচোরা তক্ষক।
সময়ের কাঁটা আচঁড় কেটে আঁকে জাল
গতির কাঁচি ধার নিয়ে যুদ্ধ করে।
অনীহায় সূর্যালোক হারালে
মেঘ তাড়িয়ে দৃশ্যমান করে চাঁদ,
স্নিগ্ধ মায়াবী আলোয় রাত ভাসে
ভাসে চাঁদ চোখে
ভাসে জলের ওপর
আমি ছুঁতে যাই
চাঁদ কেঁপে কেঁপে হারায়।
আমি জোছনা মেখেও দিব্যি
আর জোছনাই জানি
মহিমান্বিত করে কলঙ্কিত চাঁদ,
কেন যে তবু ছুঁতে চাই
কেন যে মিছে পেতে চাই
বাসি বকুলের ঘ্রাণ মেখে কেন যে
নিরুত্তাপ চাঁদের আলোতেও ঝলসে যাই!
জানি না, জানিই না তবুতো জানি
জীবনই সুন্দরের উপমা।
বিস্মৃত করে নিকট অতীত
ফাগুন আমায় রাঙাও ফের।
১১.
মুক্তি
হাতে থেকেও ফসকে যাওয়া কপাল
সময় হারিয়ে সময় হওয়া হাত
পায় না খুঁজে সেই কথা দেয়া-নেয়া মন
আহা কাতর জীবন, কত যে যাচে-মাগে
করুণাও পায় না তবু!
'ক্ষমা করো'
'ভুলে যাও'
'ভালো থাকো'
আরও কত যে আকুতি মাখা আবেদন!
নীল-কালোয় মাখামাখি আহা জীবন,
মরে যা
ধ্বংস হ'
বিস্মৃতির কূপে হারা;
মুক্তি মিলুক তোর
মুক্তি মিলুক তার।
১২.
কোয়ারেন্টিন যাতনা
তুমি বন্দীদশায় একাকী ঘরে
কাটাচ্ছ সময় তাও কমবেশি অসুস্থতায়।
আমার চুপসে থাকা পকেট
খাটো হাত, মানুষটাও তাই আর
সীমাহীন অক্ষমতা সয়ে যাওয়া জীবনে
এই মুহূর্তে আরকিছু পারি বা না পারি
তোমাকে না বলা কত কত কথা কিংবা
বলে ফেলা কথাগুলোও তো আবার
শোনাতে পারতাম স্মৃতির ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে।
তারপর, শ্লেষ্মা জমা কন্ঠে কবিতা
তাও আবার তোমাকে নিয়ে লেখা
কিংবা অন্যকিছু নিয়ে অথবা
অন্যকোন কবির কবিতা হতে পারত,
হতে পারত আমাদের আরো আরো কথা,
তোমার কিছু উদাম বেফাঁস কথার মেলা
আর আমার হাসিতে লুটিয়ে পড়া।
এখনতো সাথে তোমার ডিটেকটিভ মা নেই
একটি চিলে কোঠার সুবাদে
আমারো সম্প্রতি মুক্তি মিলেছে
বাবার অতি কেয়ারিংয়ের চোখ থেকে।
পরস্পরের হাতের নাগালের বাইরে
চোখের নাগালের বাইরে আমরা,
বাইরে বাকিসব বাঁকা চোখের নাগালের
এই সময়টা একান্ত আমাদের হতে পারতো।
লেবেলসমূহ: কবিতা


0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম