কথোপকথন - ১
১.
কথোপকথনঃ বাসের সিটে পাশাপাশি
- আমি হিমালয়। আপনি?
- আমি মোহনা।
- বাহ্! বেশ তো।
চলুন তবে, একটা নদী বানানোর চেষ্টা করি।
- আশ্চর্য! কিভাবে আর কেনইবা?
- পর্বতমালার অসংখ্য ছরা বেয়ে
জল গড়িয়েই উৎপন্ন হবে নদী
সাগর সন্ধানী সে নদী এঁকেবেঁকে
বহুপথ পাড়ি দিয়ে মিলবে মোহনায়
তারপর সাগরে লীন হয়ে পৌঁছুবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
ধরে নিন এখন আমাদের এক একটা কথাই
এক এক ফোঁটা শিশির বিন্দু।
- আপত্তি নেই, হতে পারে।
কিন্তু শিশির বিন্দুতে নদী হতে যে
অনেক সময়ের প্রয়োজন!
- অনেক সময় কি, একজন্ম কেটে গেলেও
ওতে নদী হবে না!
- তবে কিভাবে কি!
- চাই মুষলধারে বৃষ্টি!
আর খুবই মামুলি ব্যাপার যদি
পরস্পর এ জন্ম পাশ না ছাড়ি।
- এটাকেই বুঝি বলে বাড়াবাড়ি।
তা, কি করা করা হয় শুনি?
- যখন যেমন ইচ্ছে।
- কেমন?
- এই ধরুন সংগত কারণেই
আপনি নেমে গেলেন মাঝ রাস্তায়
আর আমিও নেমে যেতে পারি
সংগত কারণ ছাড়াই।
- যথেষ্ট, আর ব্যাখ্যার দরকার নেই।
- ভয় পেলেন বুঝি?
- তা না, একটু সতর্ক হলাম কেবল।
আচ্ছা, আপনার এসএসসি ইয়ার কত?
- আপনি খুব হিসেবি বুঝি?
- না না, যথার্থ সম্বোধন ঠিক করা আর
কথা এগিয়ে নেবার জন্যই।
- আপনি যদি ধর্ম বিশ্বাসী হোন তো
আমি আপনার সমবয়সী, কেননা
সকল আত্মার বয়স একই।
আর যদি বাস্তববাদী হোন তো
দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই বন্ধু হওয়া যায়।
- কথায় তো খুব পারেন!
চলুন দেখি নদী বানানোর চেষ্টা করি।
- সত্যিই করবেন?
- কোন সন্দেহ?
- না মানে, সে রকম কোন সম্ভাবনা দেখছি না তো, তাই।
- আচ্ছা, চলো তুমি-আমি মিলে একটা নদী গড়ি!
২.
কথোপকথনঃ
বাসের সিটে পাশাপাশি'র কিছুদিন পর
- কী কাণ্ডজ্ঞান তোমার! কাক তাড়ুয়ার মতো
কখন থেকে দাঁড়িয়ে! আমাকে তোমার প্রেমিকা ভাবো?
- না-তো! তবে হয়তো অমন ভাবনার একদম শুরুতে আছি।
- আশ্চর্য! ভাবনার সীমানা যাই হোক, কথার সীমারেখা
থাকা উচিত। বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে কিন্তু!
- ও-ই পর্যন্ত গেলে আর বাড়াবাড়ি হবে কি?
- কি ভাবো নিজেকে?
- বিশেষ কিছু তো একেবারেই না; গড়পড়তাও নই
তারও নীচে তবে অনন্য।
- বন্ধ করবে নিজের ঢোল পেটানো!
তা কোথায় মুখ ডুবিয়ে ছিলে এতোক্ষণ?
- ঝামেলা গলা জড়িয়ে ছিল, কিছুতেই ছাড়াতে পারছিলাম না!
- করলার রস গেলার মতো অবস্থা, বিরক্তি বিষিয়ে তুলেছে মনটা!
- তাইতো মুখে লাল-নীলের আভা! হরতাল ডাকার ইচ্ছে আছে বুঝি?
- রাজনৈতিক দলগুলোর মতন অত আয়েসি তো না।
দাবী উত্থাপন ও প্রতিবাদের আরো পথ জানা আছে।
- বাহ্! চলো তবে সংলাপে বসি।
- তাতে তোমার শাস্তি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা কি?
- কে বলল! এই যে আমি বসলাম তোমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে।
- এ তো ওয়েস্টার্ন প্রপোজের ধরন!
- ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি, আমাকে গ্রহন করবে?
৩.
কথোপকথনঃ হ্যালো...
- হ্যালো। হ্যালো। হ্যালো...! কথা বলো?
এমনি চুপ থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে,
মনে হয় মরে যাচ্ছি! হ্যালো ...!
- হুম।
- ভাব ধরেছো যে বড়ো!
- পণ করেছি, তোমাকে তিলে তিলে মারবো।
- সেও ভালো, তোমাকে পাশে পাবো অনেকদিন।
- ঢংয়ে গা জ্বলে যায়!
- আমি যে জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে যাচ্ছি!
- ফু দিই তাহলে?
- না-না, উড়ে যাবো যে!
- সত্যিই দিলাম তবে, ফু...!
কি হলো? কথা বলছো না যে?
হ্যালো। হ্যালো! হ্যালো...!
- হুম।
- এতোক্ষণ কোথায় ছিলে?
- উড়ো ছাই জড়ো হলো
আমি ফের পুনঃগঠিত হলাম।
এবার অন্যকিছু দাও।
- অসভ্য! রাখছি।
- না-না, তেমন কিছু না!
হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো...!
৪.
কথোপকথনঃ ক্ষুদে বার্তা
- তোমার কী কাণ্ডজ্ঞান বলো তো দেখি?
সেই যে সকাল গড়িয়ে বেলা হলো
এই বেলাও গড়াতে গড়াতে কোথায় যাচ্ছে দেখেছ?
- বোঝার চেষ্টা করো
ধরা খাবার পর থেকে মা পাওনাদারের মতো লেগে থাকে!
- হ্যাঁ, মা'তো তোমার মোবাইল স্ক্রীনের দিকে
দুইটা চশমা লাগিয়ে চেয়ে থাকে
টেক্সট স্ক্যান করে ভাইকে ফরোয়ার্ড করে
বাবাকে লাইভ দেখায় তারপর
আরও কতো কি যেন?
- এতো চটছো কেন?
- না না, চটবো কেন!
সূর্য পশ্চিমে ঝুকে যাচ্ছে কার জামার ফাঁকে
আর তুমি লাপাত্তা
আমি চটবো কেন!
আজ ঈদ, মহানবমী, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা
আজ নববর্ষ, বিশ্ব সুখ দিবস
আমি চটবো কেন!
প্রাণের মানুষ বেমালুম ভুলে থাকবে
তবু প্রতিত্তোরহীন আমি পালন করবো
স্তুতি নির্ভর ক্রমাগত ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ দিবস
আশ্চর্য! আমি চটবো কেন?
৫.
কথোপকথনঃ ভালোবাসার ডায়েটিং
- শুনেছো?
সূর্য নাকি আজ ক্ষাণিকটা উত্তরে উঠেছে!
- না। রাখছি। মা ডাকছে।
- না না, সূর্য পূর্বদিকেই উঠেছিল
বরাবরের মতো পশ্চিমেই অস্ত যাবে
শোনো-
- কেন এমন আজগুবিকথা বলো?
তুমি আমাকে তো জানো!
- বাহ্'রে!
গতরাত পেরিয়ে এখন বিকেল
এতোযে মিডিয়া, এতোযে শুভাকাঙ্ক্ষী
দেয়নিতো তোমার খবর কেউই;
মনে হচ্ছিল বুঝি পাল্টে গেছে পৃথিবীর নিয়মই!
তাই অমন করে বলেছি।
- তুমি যে কি বিরক্তিকর!
মা ডাকছে। যাচ্ছি।
- শোনো,
ভালোবাসার ডায়েটিংয়ে ভালোবাসা সূক্ষ্ণ হয় না,
মরে যায়।
৬.
কথোপকথনঃ গান
- কার গান শুনছো? শুনিতো একটু। ওহ্!
উনার গায়কী আমার ভালোই লাগে না।
অকারনে নাকো নাকো করে গায়।
- কিছু তো সত্যিই। তবে...
- তবে কি?
- ফর্মাল পোশাকে ওনাকে আমার দারুণ লাগে!
- মোবাইল স্ক্রিনে খুব দেখা হচ্ছে বুঝি?
- কয়েকবার দেখেছিই তো তবে তা প্ল্যান করে না।
- বাহ্ বাহ্! বেশ বেশ! তা ডিভাইস ছাড়াও দেখা শুরু করেছ তো?
- উঠেপড়ে জোর করে ট্যাগ খাওয়ানোর দরকার আছে কি!
আমি এমনটা যে না সেটা তো তোমার জানা। নাকি?
- জানা। তবু...
- এতো যে বলি, খাওয়া-দাওয়া'টা করো ঠিক করে, তখন?
৭.
কথোপকথনঃ গোলাপ
- তোমার ভাবসাব এখনই সন্তানের স্কুল এডমিশন
উতরানোর টিচার খোঁজা অভিভাবকের মত!
বিয়েরই খবর নেই এখনই এমন হলে পরে কি অবস্থা হবে?
- বিয়ের খবর নেই মানে?
দিনরাত কান্নাকাটি, দেবী আহ্বান, নানা দাবী
এগুলো করে করে কে আমার মাথাটা খাচ্ছে শুনি?
- ইথারে যে তান্ডব তুলেছ
একটু পর যে সমুদ্রে ঝড় উঠবে! শান্ত হও।
দেখো, রক্তের কাছাকাছি রঙের একটা গোলাপ।
- মাথা গরম করে দিয়ে এখন তেল ঢালছো?
- কি-সব আমলাতান্ত্রিক কথা! এই গোলাপটা কারো গাছ
কি তোড়া থেকে আনিনি। দোকানির একগাদা গোলাপের মাঝ থেকে
বেছে বার করতে গিয়ে কেমন কাঁটা খেয়েছি দেখো!
- গোলাপ বাছার সময় কোন্ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলে
যে কাঁটা ফুটে গেল?
- ধ্যাঁত! এই গোলাপ কোন ছাগলকে খাওয়াবো
তবু তোমাকে দিচ্ছি না।
- হয়েছে। দাও দেখি।
- না। অনেক হয়েছে!
- দাও? ভালো হবে না বলছি!
- খারাপই হোক, তবুও না।
- শোনো? দাঁড়াও বলছি।
- একদমই না!
- তোমার খোঁজে আঙ্কেল কে ফোন দিচ্ছি তাহলে ...।
৮.
কথোপকথনঃ বঁড়শি
- কি চাও? এই-যে!
সাড়াশব্দ নেই কেনো!
- নৈঃশব্দের ভাষা নিশ্চয়ই বোঝো!
তবু না বোঝার ভান প্রহসন লাগে এ অধমের।
- আমি এমনি। পোষাবে?
- বঁড়শি যে নিয়ে গেছি পাকস্থলীতে।
- এখন? বোঝো মজা। মনে আছে, কবি'র সে-ই ভাব?
"প্রেম খুবই বিরক্তিকর। সংসারও স্বশ্রম যাবৎজীবন
পুতুপুতু কথার ন্যাকামী। দেবী বন্দনার চেয়েও জটিল
স্তুতি পাঠ।" আরো কতো কি!
- কবিমন তো এমনই!
কখনো নির্লিপ্ত, কখনো স্বেচ্ছায় আত্মাহুতিতেও রাজি।
- এখন উল্টিয়ে বলো কথাগুলো? বলো?
- এ-যে প্রতিশোধ প্রবণতা! প্রয়োজন আছে কি?
- আছে। বলো? বলতেই হবে। এখনি বলো?
- ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি।
লেবেলসমূহ: কথোপকথন


0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম