কথোপকথন - ৪
১.
কথোপকথনঃ মধু পুরাতন, পাত্র
- তোমার হাতটা দেখি।
- উদ্দেশ্যটা কি? সত্যিই কি জ্যোতিষশাস্ত্র কিছু
জানা আছে নাকি হাত ধরার বাহানা?
- সত্যিটা বলবো? কিছু মনে না করলে
বলতে পারি।
- মিথ্যে না বললেই হলো।
- ইচ্ছে করে তোমার হাতদুটো ধরতে।
সুযোগ আর সাহসের এতো অভাবে
আর ধরা হয়নি!
- তাই বুঝি?
- অন্য প্রয়োজনে এটা-ওটা বিনিময়ে
নিজেদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে তোয়াক্কা না করে
যেদিন আঙ্গুলেরা আলতো ছুঁয়ে নেয় পরস্পর
সেতারের তারে যেন টোকা দিয়ে যায়
তারও তিন-চার দিন বয়ে চলি সেই ঘোর।
- আজকাল এই চলছে?
- তবে কি ব্রেক কসবো?
- পাবলিক, জেব্রা ক্রসিং, স্পীড ব্রেকার
দেখে চলা ভালো।
- কাগজপত্র নেই, মামলা খাবার ভয় তো থাকেই।
- ট্রাফিক সার্জেন্ট সদয় হলে ছাড় পেতেও পারেন।
- যাইহোক, তোমার হাতের রেখা বলছে
চন্দ্র, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র তোমার চারপাশে ঘিরে। তাই
সুখে, জ্ঞানে, ধনে, প্রেমে তোমার জীবন পরিপূর্ণ।
- হয়েছে-হয়েছে। কাছাকাছি এমন কথা বেশ ক'জনই
বলেছে তাও হাত না ধরেই।
- হতে পারে মধু পুরাতন, পাত্রটা তো নতুন।
- আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আশেপাশের লোক
ভীড় করবে। এবার তো হাতটা ছাড়ুন?
২.
কথোপকথনঃ সেল
- দারুণ একটা খবর আছে।
- তবে যে শুনতেই হয়।
- ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে তুলে ধরেছি হৃদয়।
নেবেন? জিততে না পারলেও
হারবেন যে না সেটা নিশ্চিত।
- শুনেছি পুরাতন, আটকে থাকা কিংবা
অচল জিনিসের নাকি সেল চলে।
মলে ক্লিয়ারেন্স সাইড দেখলেই
তার কিছু আভাস পাওয়া যায়।
- শোনা কথায় কান দেবেন না তো!
পরখ করে দেখুন না?
- তা পরখের ধরণটা বলুন দেখি?
- কার কেমন করে পরখ করতে
ভালো লাগে তা কিভাবে বলি!
- জিনিস আপনার তাই আপনিই তো
ভালো ধারণা দিতে পারেন। তাই না?
- বেচা বিক্রিও যে কি কঠিন ব্যাপার
সে আপনার মত ক্রেতার সম্মুখীন হলে
তবেই বোঝা যায়!
- ভালো জিনিস কি আর
ক্রেতার চোখ এড়ায়।
- যাহ্ বাবা! এমন আগুনে খবরে
এভাবে পানি ঢেলে দিলেন?
- দিলাম। এরপর
আরও ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন।
৩.
কথোপকথনঃ অভ্যেস
- সিগারেট একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?
- হুম।
- ফুসফুস পোড়াতে ভালো লাগে?
- একবার তো জানতে চাও না
কেনো পোড়াই ভেতর?
- আহা! মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে।
আচ্ছা, কেন?
- মন পোড়ে বলে।
- মন কেনো পোড়ে?
- বিশেষ একজন বোঝেনি বলে।
- সেই বিশেষ একজন বুঝলে মন সারবে?
- সারবে কি? মহাআনন্দে উড়বে!
- তবে মন সারলে সিগারেট বাদ?
- অভ্যেস বদলাতে সময় লাগে না!
৪.
কথোপকথনঃ সমস্যার সমাধান
- আপনার সমস্যা কি? কখন আসার কথা
আর কখন আসলেন?
- আগেই বলে রাখছি, আজ একটু
অন্যমনষ্ক থাকতে পারি। এই ধরুন-
একটু অসংলগ্ন কথা, কখনো
অতি উত্তেজনা, হুটহাট দরকারি কাজ
বা কিছু মিস করা বা ফেলে দেয়া, ইত্যাদি।
- কেন?
- আজ আপনাকে নিয়ে অদ্ভুত এক
স্বপ্ন দেখেছি। সেই ঘোর এখনো ছাড়েনি!
- সত্যি করে বলেন তো, এর আগে
ক'জন কে এমন করে বলেছেন?
- আপনার সামনে গেলেই এক বোকা ভূত
মাথায় এসে বসে!
ক্লাস টু'র শিক্ষার্থী মনে হয় নিজেকে
জ্ঞানী শিক্ষকের সামনে
যা বলবো তাই বুঝি ভুল হয়ে যাবে!
- প্রতিদিন আমাকে ক'টা রাউন্ড এবাউট
পার করতে হয় জানেন?
সেই আমাকে ইউ ট্রার্ন চেনান! থাক।
বললেন নাতো, এবার এটা তো বলেন,
আপনাকে কি বলে সেই মাপের একটা
ঝাড়ি দেয়া যায়?
- আশ্চর্য! আবহাওয়ার পূর্বাভাস তো
অন্যরকম ছিল। আমি নিশ্চিত যে কোথাও
আপনার সমস্যা হচ্ছে।
- জী, আমার সমস্যা হচ্ছে।
কিছু অর্ডার করা আছে, খেয়ে বিল মিটিয়ে
আপনার ঘোরের মাঝেই থাকেন।
আমি আমার সমস্যার সমাধানে যাচ্ছি।
- আরে... আরেহ্... হচ্ছেটা কি...?
৫.
কথোপকথনঃ ভালোবাসি
- একবার বলো না 'ভালোবাসি'!
- তুমি আগে বলো?
- ভালোবাসি, ভালোবাসি।
- আচ্ছা।
- কি হলো?
- জানলাম।
- ভালোবাসি।
- হুম।
- ভালোবাসি।
- ঘৃনা করি।
- পারলে এমনটা বলতে?
- ওটাই ভাবলে!
আমার যে শুনতেই ইচ্ছে করছিল।
৬.
কথোপকথনঃ একদিন সাবেকের সাথে
- কেমন আছো?
- ভালো-খারাপের হিসেব করতে
ইচ্ছে করে না।
- প্রেম, বিয়ে কিছু কি করবে না?
- চারপাশে দেখলাম কতো!
সবাই তো মোহ মেটাতে আসে তারপর
জীবনের নিরাপত্তার হিসেব মিলিয়ে নিয়ে
প্রেমের দার্শনিক বুলি আওড়িয়ে
নির্দ্বিধায় কেটে পরে। তাই ...।
- আমি তো স্বেচ্ছায় হারিয়েছি তোমার
জীবন থেকে, তবু এখনও কেন ...?
- হারিয়ে আর কতটুকু হারালে
আদৌ পুরোপুরি হারায় কি কিছু?
হারিয়েও কতকিছু আরো সজীব হয়ে
বেঁচে থাকে স্মৃতিতে!
- শেষমেশ যাইহোক, আমাদের
ভালো থাকার কথা ছিল।
- একসময় কথা তো এও ছিল
জলের মতো মিশে থাকবো দুজন।
- দোষ কি আমার একার ছিল?
তোমার খেয়ালিপনা, দাঁড়াবার স্থানহীনতা
সেসবও কি নিয়ামক ছিল না?
- শত হাহাকারহীন অভাব নিয়েও
ভালোবাসে যে প্রাণ
তার ক্ষতে নুন নাই ছেটালে।
এটুকু সংযম থাকবে মানুষের
এমন প্রত্যাশাটুকুও আষাঢ়ে গল্প হবে কি?
- দার্শনিক কথা তুমিও কম বলো না।
যাইহোক, আমার ঘুরেফিরে মনে আসে
হেলাল হাফিজ, '... বিরহে উজ্জ্বল'।
- অস্বীকার করি কিভাবে।
- পরস্পরের বিভক্তির এই বিচ্ছিন্নতা
হয়তো ভালোই হয়েছে, বলো?
- কি জানি। তবুও হয়তো একদিন
বেদখল হয়ে যাবে পরস্পরের হৃদয়।
৭.
কথোপকথনঃ
বাস্তব যেখানে শূন্য, ভাবনায় যেটুকু মেলে
- এইযে প্রেমিক, কেমন কাটছে দিনকাল?
- দূরে গিয়ে বিরহ উদযাপন ছাড়া আর
কিছু কি রেখে গেছ আমার জন্যে?
- বেশ হয়েছে। তা এখন তোমার
নখদন্ত নিশপিশ করে না?
- না। এখন মাঝেমধ্যে উল্টো জ্বালায় ভুগি।
- সে কেমন?
- ইদানীং আমাদের পেড়িয়ে আসা মূহুর্তেরা
মনে এসে আমাকে থমকে দেয়
আর অমনি স্মৃতির দরজা খুলে
ঢুকে পড়ো তুমি অনুমতি ব্যতিরেকে!
- কি আশ্চর্য! তারপর?
- এমনি অবয়বে তুমি কেমন বেপরোয়া যেন
হুটহাট টানাটানি শুরু করে দাও
যখন-তখন, এটা-ওটা, এখানে-সেখানে
যখন যা ইচ্ছে হয়!
- ভাবনার ভেতরেও এত বাড়াবাড়ি!
কবে এমন করেছি শুনি?
- আমাদের বাস্তবতার হিসেব এখানে
বিবেচ্য নয় প্রিয়।
- বুঝলাম। তারপর?
- তারপর ভুল ভেবে আচমকা আঁতকে উঠি!
ক্ষানিকটা কর্পূরে আক্ষেপ হলেও
মন বলে এও বেশ।
- সত্যিই মন বলে এও বেশ?
- বাস্তব যেখানে শূন্য, ভাবনায় যেটুকু মেলে
তাই কি অসামান্য না?
৮.
কথোপকথনঃ গোয়েন্দা
- আবারও! আপনাকে না করেছি আমার
সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করতে?
- আমার যে এছাড়া আর কিছুই
ভাল্ লাগে না।
- ভাল্ লাগবে কি করে, কাজকর্ম নাই।
আপনার তো বৃষ্টি জলে স্নান আর
রৌদ্র তাপে গা শুকান! আহা!
- মানে কি?
- মানে, বাপের হোটেল-মায়ের হেঁশেল।
- খোঁটা দিলেন?
- সে কি! আপনি কত ভগ্যবান।
এমন জীবন ক'জন পায় বলুন?
- কি সুরেলা শক্ত কথা!
দুদাঁতের মাঝে নুড়ি পরলো যেন।
প্রহসনে প্রশংসা হচ্ছে বুঝি?
- উকিল হলে ভালো করতেন।
- যা করছি সেটা বুঝি কম ভালো?
- কি এমন করছেন?
- আপনিও বুঝি আমার কাজকে অযথা
মনে করেন?
- শুধু ভালোবাসায় জীবন বাঁচে না মশাই।
আচ্ছা, ড্রাইভ করতে পারেন?
- আমি অটোরিকশাও চালাতে পারি না।
- তাতে কি! ঠিকই তো মেয়েদের নিয়ে
অটোরিকশায় ঘুরতে পারেন।
- আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
- হয়তো। তা গতকাল সাথে থাকা
ঐ মেয়ের সাথে আপনার সম্পর্ক কি?
- যেমন আপেলের সাথে মধ্যাকর্ষণের।
- লজ্জা করছে না বলতে?
- সচলতার জন্যে কিছু অচল জিনিসের
প্রয়োজন হয়ই। আর একপলক দেখেই
সবটুকু সত্যি জানা যায় না। জানেন তো,
যমজেরও থাকে বাধ্যতামূলক বৈপরীত্য।
- এই, রাখুন তো!
আপনার কথার প্রেমে পড়তে চাই না।
- তবে?
- পালাবো। আপনার থেকে পালাবো।
- তবে আমি জীবনের লক্ষ্য পেয়ে গেছি।
- অবশেষে পেলেন?
- আপনি দ্রুত পালান। কিসের কি!
আমি গোয়েন্দাই হবো।
লেবেলসমূহ: কথোপকথন









