মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৩

বিরহের কবিতা - ১



১.

ডিমেনশিয়া 

এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

ঝাপসা সে চোখের মায়া, ঝাপসা সে মুখ

তিলগুলো যেন কোথায় কোথায়

মনে পড়েও পড়েই না যেন!


বুকের কোথায় যেন দাগ হয়েছিল

কোথায় যেন বাঁধ ভেঙ্গেছিল

উপর না নীচ কতোটা ফুলেছিল

রক্ত গড়িয়েছিল ঠোঁটের কোন্ কোন থেকেও

সব কিছুই মনে করতে পারি না।


ভদ্রলোকেরা তো জোর করেই ভুলে থাকে

ঐশীগ্রন্থ মাথায় নিয়েও কতো

অবলীলায় নিখুঁত করে মিথ্যে বলে

সচল রাখতে বর্তমান করবেই বা কী!

চারপাশ ঘিরে এতো অস্থিরতায়

প্রায়ই বোধ হারায় মানুষ।


আমি আবার অমন না, এইখানেতেই

অন্যদের চেয়ে চালাক বোধয়

কেমন করে মুঠোফোনের সংখ্যা ভুলেছি

ভুলেছি অসামান্য কতোকিছুর দিনক্ষণ

কেমন করে, কিভাবে যেন, মনে নেই!


আমি একটু কেমন যেন

এক থেকে দশে থাকি না, একেবারেই নিরানব্বই

আর এক হলে একশো হতো

আর এক মিলতে মিলতে মেলেই না শেষে

একদিন নিভে গেলে একশো বিয়োগ একশো

ফের শূণ্য হতো, অথবা প্রকৃতির খেয়ালে

ফের মনু বা আদম হতো।


এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

কিছু মানুষ কেনো যে তাও

হঠাৎ হঠাৎ তোমার কথা বলে!



২.

ভালোই আছো

বেশ তো ভালোই আছো

দিন কি রাত রুটিন করে ক্রাশ খাচ্ছো

চার রঙে ছবি ছড়াচ্ছো নেট দুনিয়ায়

রিঅ্যাক্ট আর কমেন্টের মরীচিকায়

মাগজিক শ্রমে ঝড়াচ্ছো ঘাম

নিয়ে ভরপুর ব্যস্ততা।


আধুনিক মানুষিকতা মানুষের চেয়ে

যন্ত্র ভালোবাসে বেশি

কান্না-হাসি-শিৎকারের মতো প্রাকৃতিক

আওয়াজ কি ভঙ্গিতেও আনে আধুনিকতা।


কেমন সেকেলে ভেতর-বাহির নিয়ে

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দু'পলক তাকাতেও

কেমন যেনো ঠকবাজ লাগে নিজেকে।

চলন্ত ছবির মতো ভেসে ওঠো কেবল

মন বলে ওঠে, তুমিই সুন্দর।


বেশ তো ভালোই আছো,

'ভালো আছো' ভাবতেও ভালো লাগে।



৩.

উড়ো কথা 

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।

মাঝে মাঝেই নাকি আসো এদিকে?

কোথায় কোথায় যাও,

সঙ্গে কে কে থাকে?

রিক্সা পছন্দের বাহন ছিলো,

এখনো কি তাই?

আমার হাত ধরে চিনেছিলে যে শহর

ভোর-বিকেলের স্নিগ্ধ প্রতিবেশ

সকাল-সন্ধ্যার ব্যস্ততা, ভীড়, জ্যাম

ঢিলেঢালা জামার মতো ফ্রি-স্টাইল দুপুর 

নিয়ন আর সোডিয়াম আলোয় মোহনীয় রাত

এখনো তেমনি বরং জমকালো আরো।

তুমিও ঢের সম্পূর্ণ এখন

তাই কখন আসো, কখন যে যাও

বোধয় পাখিরাও জানে না ঠিকঠাক, তবু

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।



৪.

ক্ষোভের গ্রাফিতি

তোমার ছবিগুলোও কথা বলে

মুছে ফেলছি তাই

চৈনিক শিল্পকারিগরের কাটা হাতের

অক্ষমতার অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকি

বারে বারে মনে হয়

এ শহরে তুমি আর নেই!

জোর করে ভুলে থাকি

জ্যামিতিক জীবন, বিগতক্ষণ

ভেতরে তখন, একলা কপোত

আপন মনে কোন্ খেয়ালে

দু'পায়ে মাটি নিঙড়ায়

অক্ষম ক্ষোভে গ্রাফিতি আঁকে!



৫.

দেখা নেই আজকাল

আমাদের দেখা নেই আজকাল

দিনদিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছো

তন্দ্রার ভেতর,স্বপ্নের ভেতর

ঘুরে ফিরে অসম্পূর্ণ চিত্রকল্পই সার!


নিজের সাথে নিজেই বেইমানী করে

তুমি কি দূরে সরে যাচ্ছো?

মাঘের কনকনে বাতাসের মতো

লাগে তোমার কথার ঝাপটা

কেমন অচেনা গন্ধ ঢাকো দামী পারফিউমে

এক সময় তোমার শরীর জুড়ে

থাকতো নির্মোহ সবুজের ঘ্রাণ

ছিল সমানুপাতিক ভালোবাসাময় মন

যে মন বিকাতো না অন্য কোথাও

কোথা থেকে কী হলো আজকাল!


চিলের চোখ নিয়ে ঘুরে টিকটিকি স্বজন

আমাদের আর দেখা নেই আজকাল।



৬.

কোন এক সাবিত্রী কে

শোন্ সাবিত্রী, তুই আসার আগেই 

জেনেছি, 'সত্যবান' বড্ড বেমানান এখন 

আর 'হরিসচন্দ্র' মীরাক্কেলীয় 'নন-ভেজ' 

তবু একগুঁয়ে বুমেরাং মন 

ভিন্ন ভিন্ন পাঠশালায় অভিন্ন পাঠে 

আজ দৃঢ়, আধপোঁড়া, চোঁখা তীর 

অগুন্তি অনুরাগে বোনা সোনালী জালের

মোহ ছেড়ে 

একবার যদি বেরোয় 

শারদ দেবীর কসম, অকাল বোধনেও কিচ্ছু হবে না।



৭.

স্বজন আগুন

সেই যে জেনেবুঝে ধাক্কা দিয়েছিলে

এক গ্রহসম জলজ্যান্ত আগুনে,

পুড়েছি নির্দয়ের মতো শুশ্রুষাহীন

বাধ্য হয়েই শ্রাবণ কি ফাগুনে।


শেষে আগুন এখন স্বজনের মতো

আর সেই আমিটা ফিনিক্স হয়ে উড়ি,

আগুন দেখলে ঝাপ দিই

অবলীলায় আগুন পান করি।


পোড়াই বাহির-ভিতর অকৃত্রিম উল্লাসে 

আক্ষেপ হয়ই না এখন,

ইচ্ছে স্বাধীন এমনিই পুড়ি

পুড়তে ভাল্ লাগে ভীষণ!



৮.

শুনছো কি

আমিও তীর্থের কাকের অপেক্ষা নিয়ে 

ময়ূর পুচ্ছের অগুনিত চোখে

চাতক মনে বসে থাকি,

সময়ের প্রবাহে ঋতু পাল্টায়

আর তুমি যে কোথায়

কোন্ খেয়ালে অবসরের ব্যস্ততায়

আমার দিনলিপিতে পড়ে না চোখ!

ঘুমে কোন্ মেঘের মরীচিকায় আঁকছো হাবিজাবি 

যথেষ্ট হলো না কি?

থিতু হও প্রিয় এ হৃদয়ে

নেড়েচেড়ে দেখো, এখানেও 

অমানিশার পরে জোছনায় ভাসে

ক্ষরার পর প্লাবনে সিক্ত হয়

শিশির বিন্দু হিরণ্ময় দ্যুতি ছড়ায়

পাখির আবাহনে বসন্ত বয় তবু

কোন্ মোহের ঘুমে কাতর থাকো?

জেগে ওঠো প্রিয়, দেখো

সত্ত্বাধিকারী বিহীন হৃদয় প্রকোষ্ঠের অনন্য স্থান 

ধূপ ধোঁয়ায় মেঘের রাজ্যপাট এঁকেছে!

মোহের ঘুম ছেড়ে উঠে এসো 

উঠে এসো প্রিয়, 

ডাকছি ভীষণ, শুনছো কি?



৯.

বিবাদী

বেঁচে থাকার কমছে বয়স এখন

জমছে মেদ এদিক ওদিক

টান্ হারাচ্ছে ত্বক

টানছে হাত প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন।


টাটায় খুব চোখ দুটিতে

গর্ত হচ্ছে দাঁতে

কালি জমছে ফুসফুসে

হৃদপিণ্ডে বাড়ছে বর্জ্য আয়েশে

পাকস্থলি অনিয়মের ভাগারে

যাপিত জীবন খেয়ালের রথে চড়ে

কসরতহীন অঙ্গাদি ডেকে ডেকে

বাধ্যতামূলক করছে ঔষধকে।


আক্ষেপ এভাবে পেড়িয়ে যাওয়ায়

রাখিস্ না যে খবর

বুকের চিনচিনিয়ে ব্যাথায়

বিবাদীর নাম কিন্তু তোর।



১০.

ঊনপঞ্চাশ বায়ু

পুকুর ভালোবাসলো এক শঙ্খচিলকে। এক গ্রীষ্মে সে সমুদ্র পেরুতে গিয়ে ঝরের কবলে পড়ে কোথায় যে মিলিয়ে গেল কেউ জানে না! সেইথেকে পুকুরের সমুদ্র ছোঁবার বাসনা। কি কি করে একদিন নিমন্ত্রণ করে আনলো এক ইঁদুরের পাল। ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে থামলো। সেবারই বর্ষায় গর্ত দিয়ে পুকুর গিয়ে নদীতে মিশলো। তারপর ছুটলো সমুদ্রের দিকে। মোহনায় গিয়ে খবর পেল, সমুদ্রের সেই জলেরা উবে গিয়ে হিমালয় ঢেকেছে। সূর্যের অনুগ্রহে সেও উবে হিমালয়ে গিয়ে দেখে, হিমালয় ঢেকে দেয়া সেই বরফের দল গলে গলে অসংখ্য ছরার সমাহারে নদী হয়ে ছুটছে সমুদ্রের পানে।

সেও ছোটে কখনো নদী থেকে মোহনা, মোহনা থেকে সমুদ্র, সমুদ্র থেকে হিমালয়। তবু আর ছোঁয়া হয় না। শেষমেষ প্রত্যাবর্তন স্বস্থানে। দিনরাত্রি তার বুকে ভাসে নক্ষত্রেরা, খেলা করে রোদ্দুর, জোছনা, ডুব দিয়ে যায় কতোকিছু; শুধু ...। 



১১.

ব্যস্ততা

ইষ্কাপনের বিবি'র ভাব তোমার শরীর জুড়ে

তবু তোমার কাছে গিয়ে বারংবার 

খুবকরে সুখ ভরে নিতে ইচ্ছে করে।

অথচ কী সাংঘাতিক ব্যস্ততা তোমার!


আহা! ব্যস্ততা, নিপুণ ঘাতক ব্যস্ততা 

আমাকে ভুলিয়ে দেয়া ব্যস্ততা,

জয়ের পতাকা তোমার মধ্য দুপুর

কি রাতেও পত্ পত্ করে ওড়ে!


ব্যস্ততাহীন বন্ধ ঘড়ি আমার হাতে

তোমার বিরামহীন! 

হায় ব্যস্ততা! তোমার আবরণে ঢেকে

আমি হই শেষ শয়ানে কমরেড।



১২.

প্রতিশোধের শব্দেরা

‌তোমার হৃদ‌য়ে পরগাছার স্থায়ী ব‌ন্দোবস্থের 

বায়বীয় দ‌লিল মা‌ড়ি‌য়ে 

অনুগ্রহতুল্য বিকলাঙ্গ অথবা খুন ক‌রে 

‌বিদায় নেব সব থে‌কে 

পাপী দে‌হের পা‌শে 

প‌ড়ে থাক‌বে জবানবন্দী 

প্রণয় বেড়ুবে গোপন বেডরুম কালচার ছেড়ে

‌কিছু মানুষ শুধ‌রে নে‌বে নি‌জে‌দের 

সাদা ফু‌লের গ‌ন্ধে শো‌ভিত পৃ‌থিবী  

তখন আ‌মি অথবা আমরা বিহীন ।



১৩.

নিখোঁজ 

তারপর তার আর খোঁজ নেই 

কত পূর্ণিমায় সরীসৃপেরা সঙ্গমে মাতলো

কাকের বাসায় কত ছানা ফুটলো কোকিলের

কত বর্ষার অলস সময়ের ভালোবাসা জানান দিতে 

গ্রীষ্মে চোখ মেললো কত মানব শিশু 

কত ফুল ঝরে গিয়েও

মধুর পাত্রে রেখেছে তার অস্তিত্ব 

তবু খোঁজ মেলেনি তার 

কারণে-অকারণে খুঁজছি কতই

খোঁজ মিলছেই না কিছুতে

তবু কেন যে লোকে বলে,

খুঁজলে নাকি মেলে। অথচ

সেই মনের অভিব্যক্তি দেখা হচ্ছেই না আর!



১৪.

শাশ্বত বর্তমান

তোর স্মৃতিচিহ্নের মতো কষ্টগুলো

ড্রয়্যারে তালা এঁটে

দিব্বি উড়িয়ে দিই সময়।

ড্রয়্যার ফেটে ফুল কি কীট

বেরুলে বেরুক, ভাবি না।

অতীত বা ভবিষ্যতের জন্যও না।

প্রতি মূহুর্তে অতীত হয়ে যাওয়া

বর্তমান নিয়েই বাঁচি।


লেবেলসমূহ:

রবিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৩

বিরহের কবিতা - ২




১.

বান্ধই

আইজ কাইল সারাদিন আমার ঘুম পায়

তবুও ঘুম আসে না রে বান্ধই

ছুডু ছুডু খোয়াবে ভইরা থাকে দুইচোখ 

পুরাণা দিনের স্মৃতির ছন্দে-গন্ধে অনাগত দিনের

গোপন খুনসুটি মিইশা হেই এক রাজভোগ যেন!

খোয়াবের রাজ্যে অহন আমি নিত্য বাসিন্দা। 


তাও আমার ভাল্ লাগে! 

অজানা এক তৃপ্তিতে জুরাইয়া যায় শইল-মন

আমি সুখের আনন্দে চিল্লান দিয়া উঠি

চোক্ষে ভাসে ঝিলমিইল্লা কতো বাতি

হুশ থাকে না গো আমার

সব ঢাইলা দিতে মন চায়!


আবার খারাপও লাগে!

বুকের ভিতরে আউলা বাতাস ঘুরতে ঘুরতে

আষাঢ় মাসের বান ডাকে

আমারে খালি ভাসাইয়া লইয়া যায়

আর নিঃস্ব বানাইয়া দেয়

অস্থির লাগে আমার!


আমার খুব ঘুমাইতে মন চায়

তবু ঘুম আসে না গো।

বেহেই কয়, আমি বেধুম ঘুমাই

তুমিও তাই শুইনা হয়ত মনে মনে গাইল পারো!

আমি কি আর ঘুমাইরে বান্ধই

চোখ বুঁইজা পইড়া থাকি কেবল।



২.

পণ

ওপারে তুই বেঁধেছিস ঘর

ঢেলে দিয়ে স্বপ্ন ঝুড়ি,

সময় কাটে নিথর আমার 

সুখ যে সুতো কাটা ঘুড়ি।


মাঝখানে তরল আগুন

পেড়ুই নিয়ে ফুটো নৌকো,

ড্যাম সিগারেটে মুখ কাহিল

টানের পর টান তবু শেষ হয় নাকো।


ভুলতে চাই, পাষাণ তোকে ভুলতে চাই 

তাই পেড়িয়েছি সাতটা সাগর

বুকে চেপে অনেক পাথর 

চতুর প্রিয়, তোকে ভুলতে চাই।


হঠাৎ হঠাৎ তবু মন কেমন কেমন!

আজও বুঝি তোকে চাই ভীষণ। 

এই-যা! কি বলছি ধুর ছাই!

চতুর-পাষাণ, তোকে ভুলতেই চাই।



৩.

সাম্প্রতিক 

ড্রোনের চোখে তাকানোই যায় না 

পার্শ্ববর্তী দেশগুলো খোঁজা শেষ,

অবিরাম খুঁজে হয়রান

প্রিয় তুমিটা নিরুদ্দেশ!


বিষিয়ে বায়ু, পুড়িয়ে সবুজ 

কালোয় ঢাকে কত রঙ,

প্রজাপতি উড়ে নাচে দেখি

দোয়েলের কন্ঠেও সরকারি ঢঙ।


আমারও বিচ্ছিরি লাগে রাতদিন 

বুঝি চরম নিয়তি এই,

জীবন বিষাদের কফি মগে 

তুমি নামক মিষ্টিটা নেই।



৪.

বাস্তবতা 

আপাত নিখাদ অভিনয়ে পেড়ুলো তো অনেকটা সময়

এখন সহজাত ইচ্ছের মতোই যাপিত জীবন

তোমার জন্য দুঃখবোধ এখন শূণ্যের ঘরে

বরং কবিতার শরীর হয়ে উঠতে পারতো

এমন বিস্মৃত অগ্রন্থিত শব্দগুচ্ছরা

সেদিনের চেয়ে হাহাকার জাগায় বড়।


এখন কোন্ আকাশে জ্বলজ্বল হয়ে ঝুলে থাকো

কোন্ বাতাসে ওড়াও মন

কোন্ ঢেউয়ে ভাসাও শরীর

কার সঙ্গে ভাগ করে আনবে আগামী

এইসব গোপন জিজ্ঞাসারা উকি মারে না।

কাটুক সময় তোমার ইচ্ছে মতো।


বেহিসেবি মন হঠাৎ যখন হিসেবি হয় জাগতিক মোহে

ডেবিট-ক্রেডিট-ব্যালেন্স নির্ভুল হওয়াই সঙ্গত

আর আমি হিসেব নিকেষের কানে তুড়ি মেরে

দিব্বি আছি আমার মতো

এখন আর মনে না করিয়ে দিলে

তোমার অস্তিত্ব মনেও আসে না প্রিয়!



৫.

বেদনার রুপ

সমৃদ্ধ ফোনবুক ভরে আছে নাম্বারে

অপারেটরের ক্ষুদে বার্তায় উপচে থাকে

প্রেরিত বার্তার ঘর করে উপহাস;

আমার আলসেমী এখন এমনি।


আমাকে নাকি খুঁজেই পাওয়া যায় না!

লোকমুখে জেনেছো নিশ্চই?

তাই নাড়োনি বুঝি আঙ্গুল

অথচ যোগাযোগ নেই কতোদিন!


যদিও কথাতো এমনি ছিলো হে সুন্দর 

সব মোহ ছেড়ে

বৃক্ষের মতো আমার ইন্দ্রীয় কেবল

তোমার সংকেতের অপেক্ষায় ধ্যানমগ্ন থাকবে

ঘড়ি, ক্যালেন্ডার হিসেব না করে!


জমকালো স্মৃতিতে ঘেরা জীবন

এমনি দীর্ঘ যোগাযোগহীনতায়

কি এসে গেছে আমাদের! 

তুমি কি আর জানো প্রিয় 

আমার বেদনাও কতো সুন্দর!



৬.

ইকারাস

ইথারে এতো যে কথা ভাসিয়ে দিই 

শুনতে কি পাও তুমি?

মনের কানে ধরা দেয় কি তার কিছু? 

হলে ভালো, না হলেও কার বা কি ক্ষতি! 

উড়ে যাওয়া শিমুল তুলো আর

কার মাথায় বসতে পারে

ঝরা পাতার শব্দের মতো

শিশির বিন্দু পতনের মত

হৃদয়ের ক্ষরণে শব্দের জন্ম হয়

মনের আকুতি ভেসে যায় কেবল

শোনো কি?

আমি বুঝি তারার থেকেও দূরের মানুষ?

আমার দহন বুঝতে তোমার 

জন্ম-জন্মান্তর কেটে যাচ্ছে!

আমি বুঝি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কেউ?



৭.

আশাবাদ 

হয়তো ফিরবে না

তারপরও যদি ফেরো!

যতই উদ্ধত থাক নাগ-নাগিনীর ফনা

যতই ব্যারিকেডের স্তূপ পড়ুক

গনতন্ত্রের মুখোস আটা চলমান

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার যুগেও

যেমন সাম্যবাদের স্বপ্ন লালন করি

তেমনি কল্পনার বিলাসিতা আবারও

বারবার নিজেকে বোঝ মানানো

যদিই ফেরো!

হয়তো ফিরবেই না

তারপরও যদিই ফেরো!



৮.

আবার মুখোমুখি 

এক কোটি বছর কি হয়ে গেছে-

আমাদের যোগাযোগ নেই!

ঘূর্ণন সূত্রের দীর্ঘ সমীকরণে

শনি-বৃহস্পতির অক্ষমতা-সক্ষমতায়

কালই হয়তো মুখোমুখি এক মঞ্চে।

জোর করেই মন পাখিকে

যেসব বুলি পড়ালে এতকাল 

রপ্ত হয়েছে তো?

নতুন আকিকায় ভুলেছে তো গোপন নাম?

লকারে জমা রাখা মূ্ল্যবান অলংকার

গিলেছে তো পুরোনো সব প্রতিজ্ঞা? 

জীবনে কত ভাবেই বেঁচে থাকা যায়! 

ভাবনার শিমুল তুলোরা ভাসতে ভাসতে

সবে উড়োউড়ির বিজ্ঞান বুঝতে চেয়েছিল

আর অমনি কালো মেঘের ঝুম বৃষ্টি

জল গড়ালো কেবল আমাদের দু’ভাগ করে।

ভাবনার পতন হলেও এখনও কী সুন্দর!

আজকের দিন পরই হয়তো মুখোমুখি

তুমি-আমি মুদ্রার মতো দুই রুপ নিয়ে;

সে অব্দি পৃথিবী বেঁচে থাক।



৯.

তুমি-আমি ও কবিতা 

অন্তত একটি কবিতার সুবাদে 

আপাত অমরত্ব পেয়ে যাবো দেখো।

তোমার নিতান্তই অযোগ্য হয়েও

একদিন জ্বলজ্বল করবো তোমার চেয়ে।

একান্তই তোমার জন্যে লেখা পঙক্তিরা যখন

নানান কন্ঠে উচ্চারিত হবে প্রেমাস্পদের বন্দনায়

তুমি কান চেপে ধরলেও জাগবে মনে

মন থেকে মুছতে চাইলে বাজবে কানে

নিরুপায় অস্বস্তিতে ভুগবেই ভীষণ 

অপ্রতিরোধ্য আমার কথার আবর্তনে!

অসঙ্গত চাওয়া পাওয়ার এ জীবনে

অন্তত একটি কবিতার জন্ম ও দীর্ঘায়ু 

নিশ্চিত করেই জীবন ছাড়বো জেনো।



১০.

আকুতি 

যেন নিশীথ হীম-কুয়াশায় বিজন গাছে 

বাদুরের মতো আছি ঘাপটি মেরে

তবু মনের ভেতর শীতনিদ্রা ভুলে 

ডেকে ওঠে বর্ণচোরা তক্ষক।

সময়ের কাঁটা আচঁড় কেটে আঁকে জাল

গতির কাঁচি ধার নিয়ে যুদ্ধ করে।

অনীহায় সূর্যালোক হারালে 

মেঘ তাড়িয়ে দৃশ্যমান করে চাঁদ,

স্নিগ্ধ মায়াবী আলোয় রাত ভাসে

ভাসে চাঁদ চোখে

ভাসে জলের ওপর 

আমি ছুঁতে যাই

চাঁদ কেঁপে কেঁপে হারায়।

আমি জোছনা মেখেও দিব্যি 

আর জোছনাই জানি

মহিমান্বিত করে কলঙ্কিত চাঁদ,

কেন যে তবু ছুঁতে চাই

কেন যে মিছে পেতে চাই

বাসি বকুলের ঘ্রাণ মেখে কেন যে 

নিরুত্তাপ চাঁদের আলোতেও ঝলসে যাই!

জানি না, জানিই না তবুতো জানি

জীবনই সুন্দরের উপমা।

বিস্মৃত করে নিকট অতীত

ফাগুন আমায় রাঙাও ফের।



১১.

মুক্তি 

হাতে থেকেও ফসকে যাওয়া কপাল

সময় হারিয়ে সময় হওয়া হাত

পায় না খুঁজে সেই কথা দেয়া-নেয়া মন

আহা কাতর জীবন, কত যে যাচে-মাগে

করুণাও পায় না তবু!

'ক্ষমা করো'

'ভুলে যাও'

'ভালো থাকো'

আরও কত যে আকুতি মাখা আবেদন! 

নীল-কালোয় মাখামাখি আহা জীবন,

মরে যা

ধ্বংস হ'

বিস্মৃতির কূপে হারা;

মুক্তি মিলুক তোর 

মুক্তি মিলুক তার।



১২.

কোয়ারেন্টিন যাতনা

তুমি বন্দীদশায় একাকী ঘরে

কাটাচ্ছ সময় তাও কমবেশি অসুস্থতায়।

আমার চুপসে থাকা পকেট

খাটো হাত, মানুষটাও তাই আর

সীমাহীন অক্ষমতা সয়ে যাওয়া জীবনে

এই মুহূর্তে আরকিছু পারি বা না পারি

তোমাকে না বলা কত কত কথা কিংবা

বলে ফেলা কথাগুলোও তো আবার

শোনাতে পারতাম স্মৃতির ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে।

তারপর, শ্লেষ্মা জমা কন্ঠে কবিতা

তাও আবার তোমাকে নিয়ে লেখা

কিংবা অন্যকিছু নিয়ে অথবা

অন্যকোন কবির কবিতা হতে পারত,

হতে পারত আমাদের আরো আরো কথা,

তোমার কিছু উদাম বেফাঁস কথার মেলা

আর আমার হাসিতে লুটিয়ে পড়া।

এখনতো সাথে তোমার ডিটেকটিভ মা নেই

একটি চিলে কোঠার সুবাদে

আমারো সম্প্রতি মুক্তি মিলেছে

বাবার অতি কেয়ারিংয়ের চোখ থেকে।

পরস্পরের হাতের নাগালের বাইরে

চোখের নাগালের বাইরে আমরা,

বাইরে বাকিসব বাঁকা চোখের নাগালের

এই সময়টা একান্ত আমাদের হতে পারতো।



লেবেলসমূহ:

শুক্রবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৩

উড়োচিঠি

 




উড়োচিঠি - ১

তোমাকে ভুলতেই হবে ভেবে ভেবে আমিও এক ক্যান্ডিয়া জাহাজে যাত্রী হয়ে ভেসে যাবো বলে জলরাশির দিগন্ত রেখায় খুঁজেছি চিমনি। 

ওদিকে ফাঁকা রাস্তায় পাতারা নির্বিঘ্নে রাস্তা পেরোয় হাওয়ার হাত ধরে। আকাশে জটিল জ্যামিতি এঁকে চলে আকাশযান। 

এদিকে বারবার মনে পড়েই যায় সেই ফাঁটা ঠোঁটের আদর। খেলনা রেলগাড়ীর হুইসেলের মত প্রচন্ড প্রশ্বাস। ডায়াফ্রামের উন্মাতাল উত্থান-পতন। 

প্রেম মোমের মত, একবার জ্বলেই শেষ হয়ে যায় না তো।



উড়োচিঠি - ২

তোমার মাথা আমার কাঁধেই হেলুক শুধু, তেমনি আমারটাও। বুকে কান পেতে শুনবো ঢিপঢিব শব্দের ছন্দে অনুক্ততার গান, মুখ গুজে চুপি দেবো স্বর্গের জানালায়। জড়িয়ে ধরে মৃদু উষ্ণতায় হবো সতেজ, ট্রেনের চলার ছন্দে মাতাবো শরীর। আমরা পরস্পরের চোখে দেখবো মুগ্ধতার বিস্ময়, ডুবে থাকবো মোহনীয়তায় শিখে নিয়ে সূর্যমুখীর ধ্যান। ক্রমশ বর্তমান ও ভবিষ্যতের মূহুর্তরা অতীতে জমবে জীবন চক্রের আবর্তনে। তারওপর ফের পরস্পরের নিঃশ্বাসে ভেসে যাবো দুজন জন্মান্তরে।



উড়োচিঠি - ৩

তোমার বাড়ির পাশের বাস্তায় ল্যাম্প পোস্ট, মিউনিসিপ্যালিটির কল, ডাক বাক্স, চায়ের স্টল সবার সাথেই আমার নিবিড় সম্পর্ক। রাস্তার ধারে ফলজ, বনজ আর ঔষধি গাছের সংখ্যা জানি। চিনি ফোটা ফুলের ঘ্রাণ। 

শুধু কি তাই! তোমার ভেন্টিলেটরে জোর করে বাসা গেড়ে বসা চড়ুই এর বৃত্তান্ত জানি। জানি আমার ঈর্ষা জাগিয়ে তোমার বসার ঘর ঢুকে পড়া হকার আর পত্রিকা-ম্যাগাজিনের নাম। মুখস্থ দরজা-জানালার পর্দার রঙের মত তোমার রুটিন। তোমার পছন্দ-অপছন্দের তালিকা মুঠোয় পুরে গিলেছি জ্বরের অষুধের মত কবেই। চিনছি একটু একটু করে মনের জ্যামাতিক অলিগলি।

আমার এত্তসব চেনাজানা আর জানাশোনায় কিচ্ছুটি হচ্ছে না তবু। তুমিই শুধু কেমন কুয়াশা মোড়া, ধোঁয়াটে সন্ধ্যাের মত, গলতে চেয়েও না-গলা বরফের মত!



উড়োচিঠি - ৪

জেনে রাখো প্রিয়, আমার চোখের চেয়ে মুগ্ধতা আর কারো চোখেই পাবে না যেন। আর কারো চোখেই উৎসবের আমেজে করবে না আনন্দের অশ্রুতে এতো ঝিকমিক। তার চারপাশে না-কি এমনিতেই ময়না-ফিঙে নাচে, পায়ের কাছে জড়ো করে এটা-ওটা। সে-চোখের সামনে তুমি আর্তের মতন বসে থাকবে কাক হয়ে তবু ক্ষণে ক্ষণে সে চোখ বাড়াবে কোকিলের দিকে। তোমার ও চোখ ভিজবে-শুকাবে, তার চোখ শীতল। সে জানে, এমনি চোখেই ঘায়েল হবে পাখপাখালি। দুমড়ে মুচড়ে যাবে সংশ্লিষ্ট আরও কেউ। তার গলার মালায় নেতিয়ে পড়া অনেক ফুলের সাথে বাঁধা পারবে বৃন্তচ্যুত আরও একটা ফুল। মগজে একটা রাক্ষস জিইয়ে রেখে লোলুপ হাসির আভা লেপ্টে থাকবে অনিন্দ মোহনীয়তার প্রলেপে। সেই আবেশে আত্মাহুতিতেও কার্পণ্য করবে না কত কেউ। ওদিকে বঞ্চিতের হাহাকারে মেঘ জমবে আকাশে আর সে ছায়ায় দিব্বি চলবে তার জীবন, অতিবেগুনী রশ্মি ছুঁতেও পাবে না তাকে।

প্রিয়, জীবনের মহত্ম জিইয়ে রেখো। জানোতো, স্বর্গীয় উদ্যানের ফুলের মত টবে বেড়ে ওঠা ফুলেও বিমোহিত করার মত কমবেশি গন্ধ থাকে। একটু পরিচর্যা করলে মৌ মৌ করবে চারপাশ। স্বর্গ নামবে ধরাধামে।



উড়োচিঠি - ৫

একদিন, দু'দিন, তিনদিন করে করে আরো কিছুদিন পর ফের ফাগুন আসবে দেখো। তখন এমন করে রাঙবো দুজন- সে রঙ আর ফিকে হতে দেবোই না জেনো। আঙুলের ফাঁকে গুঁজে দেব জোড়ালো আঙুল। সমাজের বাঁকা হাসি, পরিবার-পরিজনের আগুনে কি ভেজা চোখ দেখবোই না যেন! কেননা হিসেব শেষে সবাই সার্থপরতায় দুষ্ট। 

তাদের মর্জির কাছে চোখ নামিয়ে থেকে থেকেই আমরা হারিয়েছি কত মাহেন্দ্রক্ষণের হাতছানি দেয়া সময়; আমরা একসাথে জৈষ্ঠের সূর্যদয় দেখতে পারিনি, শরৎতের শিশির মাড়াইনি, মাঘের কুয়াশায় মাখিনি, ভিজিনি ভরা শ্রাবণে, জাগিনি রাত ভরা-পূর্ণিমায়, গোনা হয়নি তারা, দেখা হয়নি উল্কাপাত, হয়নি সমুদ্রস্নান, হয়না মুখে আদরে মাখানো ভাত বিনিময়, আরও আরও কতকিছু!

তারপরও তো বুঝি থাকে ঢের। তীর্থ যাত্রার আনন্দ নিয়ে ছুটে আসি রাত-বিরেতে আমরা পরস্পরের শহরে  ছুুঁতে মাহেন্দ্রক্ষণ। প্রাণে প্রাণ মিশিয়ে ফের ফিরে ফিরে আসা-যাওয়ায় শহরের ব্যস্ততায় মিলিয়ে যেতে থাকি পরস্পর থেকে, চোখ জ্বলে যায় রোদে তবু দেখা যায়নাকো। অসংখ্য স্থির আর চলন্ত ছবি চোখের পাতার ওঠা-নামায় স্ক্রল হয় কেবল। ঘুরেফিরে এমনি নিপুণ প্রেম-বিরহে কাটে একদিন, দু'দিন, তিনদিন করে করে কেটে যায় জন্মের সাথে বরাদ্দ পাওয়া সময়।



উড়োচিঠি - ৬

আমিও তোমার মতো অসুখ কিনবো ভাবছি। সবকিছুতে বিষাদের ঝাঁঝালো স্বাদ চোখ-নাক ভিজিয়ে দিচ্ছে বড়। আবেগী চুম্বনেরা পরে থাক ঝরে পড়া চুলের মতো। ভূতের কিলে একটু পোক্ত করতে চাই শরীর-মন। অনুভূতির মরচে, আদ্র পলেস্তেরা, আঠা কি পেরেক সব ঝালিয়ে নেবো নাহয় বেশ করে। সহনশীলতা আর স্থায়ীত্বের আদর্শ মাপকাঠি ছুঁয়েই ফের ফিরবো তোমার আলিঙ্গনে। তাই আমিও অজানা মোহে ছুটে যেতে চাই এদিক-সেদিক। অকারণ আয়েশে কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতে চাই কারো মুখোমুখি। অযাচিত ইচ্ছেয় নিতে চাই ক্ষানিক স্পর্শ। 

আমিতো ফিকে করেছি সব অনায়াসে। তুমি কেনো ভোলো না সহজে! আমার জীবন গোছানো কি এলোমেলো করে দেবার অধিকার তোমারই ছিলো। শেষে বেশতো টানিয়েছো অ্যাবস্ট্রাক্ট ব্যাকড্রপ তোমার-আমার আনন্দ মঞ্চে। ভাবছি- এবার নিজের হাতেই তুলে নেব শাসন দণ্ড।



উড়োচিঠি - ৭

বড় গাছের পাতাদের মত রোদ ছিনিয়ে নিচ্ছে কিছু বা কেউ। আমি যেন হাওয়ার ভাসতে ভাসতে ভূমি ছোঁয়া পাতার মতোন, দমকা হাওয়ায় উড়ে জলে বিসর্জিত শিমুল তুলোর মতোন। তুমি কি না ভাবো ধূলো ঝড়ে চোখে পড়া বালুকণা!

এমন করে আক্রান্ত হয়ো না প্রিয় যা আমি জনিত ব্যথাকে ভুলিয়ে দেয়, ফিকে করে দেয় আমার অস্তিত্ব। তুমিহীন আমার যে পরাগায়ন বিমুখ সূর্যমুখীর একগুঁয়েমির জীবন গোলক গ্রহে একদিন ঘড়ির কাঁটায় চেপে যদি বাঁক নেয় ১৮০°, তবে হয়তো ভীষণ অভিমানে আমিও খুঁজে নেব বিকল্প সুন্দর। ততোদিনে যদি যায়ও যুগ তখন তোমার পেরিয়ে যাওয়া তারুণ্য মন ভরাতে অক্ষম দীপ্ত চতুরের।

আমি কিন্তু তখনো প্রকট জীনে বহন করবো পূর্বসূরীদের তেজ দীপ্ত জ্যোতি যা অক্ষম প্রতিবেশে স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপেছে  গ্রহণের কবলে। 

এতো খোলামেলা মনে তবুও যা গোপন, বেলা শেষে স্বজন ও দুর্জনেরা জেনে যাবে ঠিক কে কাকে ঠকিয়েছিলাম কতটা। চোখের জলে উপচে পড়া বিলে হাঁসের মতন পৌনঃপুনিক মুখ ডুবিয়ে স্বস্তি খুঁজি তবু। রাত-বিরেতে একটা ডাহুক কেঁদে উঠে কেবল। বহুদূরে যেন প্রতিত্তোর হয়! কখনো আবছা বুঝি, কখনো বুঝিও না। হায়, পেয়ে গেলে বুঝি কমে যায় আকর্ষণ! পেয়ে গেলে কেন যে বেড়ে যায় অবহেলা! পেয়েও হারালে জীবন কেন যে হয় এত এলোমেলো!



উড়োচিঠি - ৮

কি ভাবো? খুব জিতে গেছো আর ভীষণ হেরে গেছি আমি? 

এখন আমার প্রায়ই শিশিরের মতো চুমু পড়ে সর্বাঙ্গে আর আমি ধুয়ে ধুয়ে সজীব হয়ে উঠি আরো। শুভ্র কুয়াশার রাতে ভুলে কাপড় মেলে রাখার মত ফেলে রাখিনা শরীর ভিজিয়ে দেবার জন্যে। পরম মমতায় একজন বুকে জাপটে নিয়ে যায় স্নিগ্ধ শীৎকারে। কনকনে হাওয়ায় জড়িয়ে ধরার বাহানা করতে হয় না। তার আগেই আদরের ধবধবে পশমি চাদরে মুড়ে যাই। বৃষ্টিতে একছাতায় জোর করে ঘেঁষতে হয়ই না। কেউ নিজে ভিজে বৃষ্টিকে ছুঁতেই দেয় না আমায়। প্রচণ্ড গরমে প্ররোচিত করে না অর্ধনগ্ন হতে। কখনো বানানো হাত পাখায়, কখনো কথার তোড়ে দখিণা হাওয়া বইয়ে দেয়।

ফেলে রাখা হাতে এখন রাখতে দিই না প্রবঞ্চক হাত। স্নেহের আঙুলে একজন পূর্ণ করে অপূর্ণতার ফাঁক। প্রতারণার স্বপ্নে আঁকি না ভবিষ্যৎ। এখন প্রতিটি দিনই স্বপ্নের অধিক। পেটের পটে ভ্রুণ হত্যার আঁচড় কাটতে হয় না। একজন আমাকেই নিয়ে আগামী শিশুর স্বপ্ন বোনে।

কী ভাবো? খুব জিতে গেছো তুমি আর আমি ভীষণ রকম হেরে গেছি? তোমার জন্যে একদলা থুতু ফেলে একজনের ঠোঁটে-মুখে চুমুতে ভাসাই, ভালোবাসার বানে ভাসি তুমুল।


লেবেলসমূহ:

বুধবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৩

কথোপকথন - ২





১.

কথোপকথনঃ বাসস্টপে


- কিউজ মি। আপনি কি বিবাহিত? 

- দেখেতো ভদ্রলোক মনে হয়েছিল! এ কেমন অভদ্রতা? 


- ভদ্র ভেবেছিলেন! এখন অভদ্র মনে হচ্ছে?

- তা না তো কি!


- দেখুন নিজেকে জোর করেই মানানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু

   মন কিছুতেই নিজেকে অভদ্র ভাবতে রাজি হলো না।

   যাইহোক, আমি খুবই দুঃখিত।

   আচ্ছা, আপনি কি মানুষের সরলতায় বিশ্বাসী? 

- তা না হলে এতোক্ষণে পরিবেশটা অন্যরকম হতো।


- তাহলে দয়াকরে বলনু, কেউ যদি সরল বিশ্বাসে

  সরল মনে, সরলভাবে কোন বিষয়ে জানতে চায় তবে

   সেটা কি মার্জনীয় অপরাধ হবে না?

- সে ভাবতে পারছি না। আমার বাস এসে গেছে। আসি।


- সাবধানে যাবেন। শুনুন, আমার বিয়ে হয়নি

   আর কোন প্রেমটেমও নেই...।



২.

কথোপকথনঃ ফোনকল 


- আচ্ছা, আমাকে কল দেন কেন?

- প্রশ্নটাতো আমারো।


- আমি জানার চেষ্টা করিনি।

- আমি ভাবিনি।


- তাহলে রাখছি।

- মানে কি!


- ব্যাপারটা আপনার ভাবনাতেই নেই যখন ...

- বাদ দিন তো পিটুইটারির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ব্যবচ্ছেদ!

 আচ্ছা, ভালোভাবে পৌঁছেছিলেন তো?


- জী, ড্রাইভার ভালভাবেই চালিয়েছিলো।

 ভাড়া মিটিয়ে 'ধন্যবাদ' বলেছি। 

- ঐ ড্রাইভারকে ডেকে যে উঠিয়েদিল

 তাকে যে কিছুই বললেন না?


- ভদ্রলোকেরাও যে এতো ঝগড়াটে হয়

 আপনাকে না দেখলে বুঝতাম না!

- এটুকুই বুঝলেন বুঝি!


- ওমা! শাকের চাপায় মাছ ছিল বুঝি?



৩.

কথোপকথনঃ স্বপ্ন 


- ভালোবাসেন?

- হুম।


- কতোটা? 

- এক মহাকাশ।


- কী আশ্চর্য! পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে বুঝতেই পারলাম না!

- টিনের চশমায় চোখ ঢাকলে আমার কি করা!

   তা, আজ হঠাৎ এমন প্রশ্ন?


- কাল একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম!

- স্বভাবিক টাইপের স্বপ্নও আপনি দেখেন?


- আহা শুনুন না!

- জী, বলুন।


- আপনি আমার পেছন ঘুরঘুর করছিলেন বলবো না... 

- বলার বাকি আর রাখলেন কই!


- কথার মাঝখানে প্যাডেল মারবেন না তো!

- একদম না। বলুন এবার।


- মানে আমি যেখানেই যাচ্ছি দেখি সেখানেই আপনি!

   আপনার ভাব-সাব যেন কেমন কেমন আর

   বারবার কি বলতে চেয়েও বলছেন না! অনেকটা

   ভালোবেসে প্রেমে হাবুডুবু খেলে যেমন করে মানুষ।

- আচ্ছা! তারপর? 


- তারপর আর কি!

   ঘুম ভেঙে গেলে ভাবলাম আপনার সাথে শেয়ার করি।

- বেশ করেছেন। আপনাকে তো বলাই হয়নি!

   আমিও আপনাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম।


- তা' কি দেখেছিলেন?

- আপনি যেমন দেখলেন তারচেয়ে একটু বেশি, তবে উল্টো।

   দেখলাম হাবুডুবু খেতে খেতে আপনি একদিন বলেই ফেললেন।

   আমি কোন উত্তর না করায় পরদিন ঘুম ভেঙে শুনি

   আপনি আর নেই, নিজেকে শেষ করেছেন!

   ভোর রাতের স্বপ্ন, আমি তাই হেলাফেলা না করে

   উত্তর রেডি করেই বসে থাকি।



৪.

কথোপকথনঃ ইচ্ছে


- মাঝে মাঝে ভাবি আর হাসি!

- কেন জানতে পারি?


- কত কী যে ইচ্ছে করে আমার! 

- কি কি শুনি?


- এই যেমন...

- শঙ্খচিল?


- করতো, এখন প্রকট অন্য কিছু! 

- জয়প্রিয় কবি হতে?


- কবি! মাঝে মাঝে মনে হয়

   কবিতাই কি আমাকে খেলো?

- স্ববিরোধীতা?


- তাও না। বরং ভাবনা আরও পোক্ত হয়েছে।

   কবিতায় আঙুরের থোকার মতো ঝুলে থাকে সুন্দর।

   কথিত সাধারণ মানুষ একদিন কবিতার স্বাদ পাবে,

   এরমধ্য দিয়েই পাবে সুন্দরের খোঁজ।

   সুন্দর ছুঁয়ে চিনবে সত্যি।

   জানবে- ঈশ্বর, স্বর্গ, ধর্ম, ব্যবসা, বিশ্বব্যাংক, উন্নয়ন

   নেতা, নির্বাচন, গণতন্ত্র, সাম্যবাদ। 

- ভারীক্কি স্বপ্ন, থাক।

   কি কি যেন ইচ্ছে করে? 


- ইচ্ছে করে! 

- হুম!


- ইচ্ছে করে...! 

- কী?


- তোমার প্রেমিক হতে। 

- কবির এই বুঝি কবিতা?



৫.

কথোপকথনঃ ক্ষুদে বার্তায় মুখোমুখি 


- কোথায়?

- আপনার কাছাকাছিই।


- বেরুবো?

- জরুরি খবর ছিল একটা। 


- আমার ইনবক্সগুলো অপ্রয়োজনীয় কথায় ভরে।

   আসছি তবে। চাও খাবো।

- তাড়াতাড়ি, তাড়া আছে।


- জাস্ট বেরুতে ক'মিনিট।

- তাড়াতাড়ি। 


- ---

- চা'টা কি রুমেই খেয়ে বেরুবেন?


- মোবাইল থেকে মুখ তুলুন।

- চা-খবর দুই'ই যে ঠান্ডা হয়ে যেতে বসেছে! 


- কোনটা আগে?

- একসাথে। 


- কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম! এমন মায়াবী বিকেলে

   জরুরি খবর নিয়ে আপনার মতো ব্যস্ত বাবুল আমার সাথে!

- শুনুন, যে ভ্রমরের প্রেমে পড়েছেন

   তার হুল কিন্তু বিষাক্ত ভীষণ!


- এই বুঝি জরুরি খবর?

- আমি তো বিশ্ব পরিক্রমা নিয়ে বসিনি

   ইদানীং আপনিই লিড নিউজ।


- কে বললো আমি তার প্রেমে পড়েছি!

   ভালো লাগা মানেই বুঝি প্রেমে পড়া?

- আমার যে প্রেমে পড়েই ভালো লাগতে শুরু করেছে!



৬.

কথোপকথনঃ ভোঁতা মুখ


- একহাজার অটো-মিশুক-রিক্সা গোনা শেষ

   তবু তার দেখা নেই!

   এখন থেকে আর গুনছি না

   আর কত দেরী বলবেন কি?

- অসময়ে হুট করেই বৃষ্টি নামলে যা হয়

   সেই দোষে দুষ্ট হয়ে গেলাম।


- দোষ ধরার ইসকুলে যাবার কথা কি আমাদের? 

- পাশ দিয়ে একটু ঢু মারতে কি এমন ক্ষতি? 


- ঐ-যে, লক্ষ্য কে হারিয়ে ফেলার ভয়!

- আচ্ছা, ভীতুরা কি কখনোই রিক্স নেয় না?


- দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে নিই না।

- এবার একটু বড় তো হোন!


- বড় আর কবে হবো?

   আমিতো এখনো সিনেমা দেখে কেঁদে ফেলি!

- কখনো যদি আমি হারিয়ে যাই, তখনও কাঁদবেন?


- আজ আর আপনার আসার দরকার নেই। 

- এসেই গেছি, আপনার ভোঁতা করে রাখা মুখটা দেখা যাচ্ছে।



৭.

কথোপকথনঃ বৈরী সময়ে প্রেম


- ইদানিং কি হয়েছে তোমার? 

- তুমি ভূতুড়ে অতীত চুলকে সুড়সুড়ি পাও,

   আমার তখন ফোস্কা ফেটে রক্ত ঝরে!


- তা' এখন কি অবস্থা? 

- বারবার মারো, আমার ভাল্ লাগে না;

   এবার নিজেকে মারছি। 


- ভাল্ লাগছে?

- লাগছে।


- ক'টা ফুকলে আজ?

- গুনিনি। আজ তোমার কি হাল?


- আমার গহ্বরে কতো আলো জ্বলে

   তবু বিপরীতমুখে পায়ের গোড়ায় অন্ধকার। 

- তোমার তো স্বপ্নের মধ্যেও মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যায়!


- জানোতো, এ কালের মশারা সরকারের চেয়েও বেশি কৌসুলি। 

- এন্টি-মসকিউটো সরঞ্জামের অভাব নেই কিন্তু। 


- আজ যে কথার তোড়ে বৈরী বাতাস!

- আমারও হয়েছে কই মাছের প্রাণ

   চরম বৈরী অবস্থাতেও ক্রিয়াশীল।


- তাহলে তো হলোই। হাসো তো একটু?

- ফের যদি অমন করো...!


- পিষে ফেলো তোমার বুকের ওপর।

- মহামারীময় এই সময়ে করমর্দনই নিষিদ্ধ করেছে সরকার!


- রাখতো! লকডাউনেও যা জ্যাম!

   কি হলো! চোখ বুজলে যে?

- চিত্রকল্পে আছি।


- অসভ্য কোথাকার! 

- কেবল তোমার কাছেই জেনো।



৮.

কথোপকথনঃ গোলাপী জোছনা 


- বড্ড বেশি পর করে দিচ্ছো আমায়

  অচ্ছুৎ প্রাণী তাড়ানোর মত হাঁকডাক কানে বাজে

  আমার ভাল্ লাগে না!

  ভাল্ লাগে না কোনকিছু!

- কী সব উদ্ভট কথা!

   মাথাটা গেল বুঝি?


- জানি না, বুঝিও না।

  পরজীবী গাছের মত আমাকে গিলে ফেল প্লিজ।

  তুমিময়তায় আবৃত হতে চাই,

  তোমার চোখে তাকিয়েই মহাবিশ্বের

  বাকি রুপের অতৃপ্তি ভুলে যেতে চাই।

- না করেছি কি?


- সেই তুমিটা কই তবে!

   মরে গেল কি?

- আশ্চর্য! মরবে কেন?

   মনে বড্ড কালো মেঘ জমেছে

   যাপিত জীবনে স্থূল প্রয়োজনের দায়ে।

   যাক আর কিছুটা সময়

   গোলাপি জোছনা নিয়ে আসবো।


- এসো তবে এক্ষুনি

   উদ্দাম আদিম নৃত্যে তুলি ঝড়

   দমকা হাওয়ার ঝড়ো বৃষ্টিতে,

   পরিছন্ন আকাশে দৃশ্যমান হবে

   গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রেরা।

- বড্ড অসময় যে।

   কত মুকুল ঝরে গেছে বিফলে,

   খরা শেষে বর্ষা আসুক

   এবার ফল পাড়বো দেখো!


লেবেলসমূহ:

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৩

কথোপকথন - ১




১.

কথোপকথনঃ বাসের সিটে পাশাপাশি 


- আমি হিমালয়। আপনি?

- আমি মোহনা।

- বাহ্! বেশ তো।

   চলুন তবে, একটা নদী বানানোর চেষ্টা করি।


- আশ্চর্য! কিভাবে আর কেনইবা?

- পর্বতমালার অসংখ্য ছরা বেয়ে

   জল গড়িয়েই উৎপন্ন হবে নদী

   সাগর সন্ধানী সে নদী এঁকেবেঁকে 

   বহুপথ পাড়ি দিয়ে মিলবে মোহনায় 

   তারপর সাগরে লীন হয়ে পৌঁছুবে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। 

   ধরে নিন এখন আমাদের এক একটা কথাই 

   এক এক ফোঁটা শিশির বিন্দু।

- আপত্তি নেই, হতে পারে।

   কিন্তু শিশির বিন্দুতে নদী হতে যে

   অনেক সময়ের প্রয়োজন!


- অনেক সময় কি, একজন্ম কেটে গেলেও

   ওতে নদী হবে না!

- তবে কিভাবে কি!


- চাই মুষলধারে বৃষ্টি!

  আর খুবই মামুলি ব্যাপার যদি

  পরস্পর এ জন্ম পাশ না ছাড়ি।

- এটাকেই বুঝি বলে বাড়াবাড়ি। 

  তা, কি করা করা হয় শুনি?


- যখন যেমন ইচ্ছে। 

- কেমন?


- এই ধরুন সংগত কারণেই

   আপনি নেমে গেলেন মাঝ রাস্তায়

   আর আমিও নেমে যেতে পারি 

   সংগত কারণ ছাড়াই। 

- যথেষ্ট, আর ব্যাখ্যার দরকার নেই। 


- ভয় পেলেন বুঝি?

- তা না, একটু সতর্ক হলাম কেবল।

  আচ্ছা, আপনার এসএসসি ইয়ার কত?


- আপনি খুব হিসেবি বুঝি?

- না না, যথার্থ সম্বোধন ঠিক করা আর

   কথা এগিয়ে নেবার জন্যই।


- আপনি যদি ধর্ম বিশ্বাসী হোন তো

   আমি আপনার সমবয়সী, কেননা

   সকল আত্মার বয়স একই।

   আর যদি বাস্তববাদী হোন তো

   দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক হলেই বন্ধু হওয়া যায়। 

- কথায় তো খুব পারেন!

   চলুন দেখি নদী বানানোর চেষ্টা করি।


- সত্যিই করবেন? 

- কোন সন্দেহ? 


- না মানে, সে রকম কোন সম্ভাবনা দেখছি না তো, তাই।

- আচ্ছা, চলো তুমি-আমি মিলে একটা নদী গড়ি!




২.

কথোপকথনঃ

বাসের সিটে পাশাপাশি'র কিছুদিন পর


- কী কাণ্ডজ্ঞান তোমার! কাক তাড়ুয়ার মতো

  কখন থেকে দাঁড়িয়ে! আমাকে তোমার প্রেমিকা ভাবো?

- না-তো! তবে হয়তো অমন ভাবনার একদম শুরুতে আছি।


- আশ্চর্য! ভাবনার সীমানা যাই হোক, কথার সীমারেখা

  থাকা উচিত। বাড়াবাড়ির দিকে যাচ্ছে কিন্তু! 

- ও-ই পর্যন্ত গেলে আর বাড়াবাড়ি হবে কি?


- কি ভাবো নিজেকে?

- বিশেষ কিছু তো একেবারেই না; গড়পড়তাও নই

  তারও নীচে তবে অনন্য। 


- বন্ধ করবে নিজের ঢোল পেটানো!

  তা কোথায় মুখ ডুবিয়ে ছিলে এতোক্ষণ?

- ঝামেলা গলা জড়িয়ে ছিল, কিছুতেই ছাড়াতে পারছিলাম না!


- করলার রস গেলার মতো অবস্থা, বিরক্তি বিষিয়ে তুলেছে মনটা!

- তাইতো মুখে লাল-নীলের আভা! হরতাল ডাকার ইচ্ছে আছে বুঝি?


- রাজনৈতিক দলগুলোর মতন অত আয়েসি তো না।

   দাবী উত্থাপন ও প্রতিবাদের আরো পথ জানা আছে।

- বাহ্! চলো তবে সংলাপে বসি।


- তাতে তোমার শাস্তি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা কি?

- কে বলল! এই যে আমি বসলাম তোমার সামনে হাঁটু গেঁড়ে। 


- এ তো ওয়েস্টার্ন প্রপোজের ধরন!

- ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি, আমাকে গ্রহন করবে?



৩.

কথোপকথনঃ হ্যালো...


- হ্যালো। হ্যালো। হ্যালো...! কথা বলো?

  এমনি চুপ থাকলে দম বন্ধ হয়ে আসে,

   মনে হয় মরে যাচ্ছি! হ্যালো ...!

- হুম।


- ভাব ধরেছো যে বড়ো!

- পণ করেছি, তোমাকে তিলে তিলে মারবো।


- সেও ভালো, তোমাকে পাশে পাবো অনেকদিন।

- ঢংয়ে গা জ্বলে যায়!


- আমি যে জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে যাচ্ছি!

- ফু দিই তাহলে?


- না-না, উড়ে যাবো যে!

- সত্যিই দিলাম তবে, ফু...!

  কি হলো? কথা বলছো না যে?

  হ্যালো। হ্যালো! হ্যালো...! 


- হুম।

- এতোক্ষণ কোথায় ছিলে?


- উড়ো ছাই জড়ো হলো

  আমি ফের পুনঃগঠিত হলাম।

  এবার অন্যকিছু দাও।

- অসভ্য! রাখছি।


- না-না, তেমন কিছু না!

  হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো...!



৪.

কথোপকথনঃ ক্ষুদে বার্তা


- তোমার কী কাণ্ডজ্ঞান বলো তো দেখি?

   সেই যে সকাল গড়িয়ে বেলা হলো

   এই বেলাও গড়াতে গড়াতে কোথায় যাচ্ছে দেখেছ?

- বোঝার চেষ্টা করো

  ধরা খাবার পর থেকে মা পাওনাদারের মতো লেগে থাকে!


- হ্যাঁ, মা'তো তোমার মোবাইল স্ক্রীনের দিকে

   দুইটা চশমা লাগিয়ে চেয়ে থাকে

   টেক্সট স্ক্যান করে ভাইকে ফরোয়ার্ড করে

   বাবাকে লাইভ দেখায় তারপর 

   আরও কতো কি যেন?

- এতো চটছো কেন?


- না না, চটবো কেন!

  সূর্য পশ্চিমে ঝুকে যাচ্ছে কার জামার ফাঁকে 

  আর তুমি লাপাত্তা

  আমি চটবো কেন!

  আজ ঈদ, মহানবমী, বড়দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা 

  আজ নববর্ষ, বিশ্ব সুখ দিবস

  আমি চটবো কেন!

  প্রাণের মানুষ বেমালুম ভুলে থাকবে

  তবু প্রতিত্তোরহীন আমি পালন করবো

  স্তুতি নির্ভর ক্রমাগত ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ দিবস

  আশ্চর্য! আমি চটবো কেন?



৫. 

কথোপকথনঃ ভালোবাসার ডায়েটিং


- শুনেছো?

  সূর্য নাকি আজ ক্ষাণিকটা উত্তরে উঠেছে!

- না। রাখছি। মা ডাকছে।


- না না, সূর্য পূর্বদিকেই উঠেছিল

   বরাবরের মতো পশ্চিমেই অস্ত যাবে

   শোনো-

- কেন এমন আজগুবিকথা বলো?

   তুমি আমাকে তো জানো!


- বাহ্'রে!

  গতরাত পেরিয়ে এখন বিকেল

  এতোযে মিডিয়া, এতোযে শুভাকাঙ্ক্ষী

  দেয়নিতো তোমার খবর কেউই;

  মনে হচ্ছিল বুঝি পাল্টে গেছে পৃথিবীর নিয়মই!

  তাই অমন করে বলেছি।

- তুমি যে কি বিরক্তিকর! 

   মা ডাকছে। যাচ্ছি। 


- শোনো,

  ভালোবাসার ডায়েটিংয়ে ভালোবাসা সূক্ষ্ণ হয় না,

  মরে যায়।



৬.

কথোপকথনঃ গান


- কার গান শুনছো? শুনিতো একটু। ওহ্!

   উনার গায়কী আমার ভালোই লাগে না।

   অকারনে নাকো নাকো করে গায়।

- কিছু তো সত্যিই। তবে...


- তবে কি?

- ফর্মাল পোশাকে ওনাকে আমার দারুণ লাগে!


- মোবাইল স্ক্রিনে খুব দেখা হচ্ছে বুঝি? 

- কয়েকবার দেখেছিই তো তবে তা প্ল্যান করে না।


- বাহ্ বাহ্! বেশ বেশ! তা ডিভাইস ছাড়াও দেখা শুরু করেছ তো?

- উঠেপড়ে জোর করে ট্যাগ খাওয়ানোর দরকার আছে কি!

  আমি এমনটা যে না সেটা তো তোমার জানা। নাকি?


- জানা। তবু...

- এতো যে বলি, খাওয়া-দাওয়া'টা করো ঠিক করে, তখন?



৭.

কথোপকথনঃ গোলাপ


- তোমার ভাবসাব এখনই সন্তানের স্কুল এডমিশন

   উতরানোর টিচার খোঁজা অভিভাবকের মত!

   বিয়েরই খবর নেই এখনই এমন হলে পরে কি অবস্থা হবে?

- বিয়ের খবর নেই মানে?

  দিনরাত কান্নাকাটি, দেবী আহ্বান, নানা দাবী

  এগুলো করে করে কে আমার মাথাটা খাচ্ছে শুনি?


- ইথারে যে তান্ডব তুলেছ

  একটু পর যে সমুদ্রে ঝড় উঠবে! শান্ত হও।

  দেখো, রক্তের কাছাকাছি রঙের একটা গোলাপ।

- মাথা গরম করে দিয়ে এখন তেল ঢালছো?


- কি-সব আমলাতান্ত্রিক কথা! এই গোলাপটা কারো গাছ

  কি তোড়া থেকে আনিনি। দোকানির একগাদা গোলাপের মাঝ থেকে

   বেছে বার করতে গিয়ে কেমন কাঁটা খেয়েছি দেখো!

- গোলাপ বাছার সময় কোন্ মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলে

  যে কাঁটা ফুটে গেল?


- ধ্যাঁত! এই গোলাপ কোন ছাগলকে খাওয়াবো

  তবু তোমাকে দিচ্ছি না।

- হয়েছে। দাও দেখি।


- না। অনেক হয়েছে!

- দাও? ভালো হবে না বলছি!

 

- খারাপই হোক, তবুও না।

- শোনো? দাঁড়াও বলছি।


- একদমই না!

- তোমার খোঁজে আঙ্কেল কে ফোন দিচ্ছি তাহলে ...।



৮.

 কথোপকথনঃ বঁড়শি


- কি চাও? এই-যে! 

   সাড়াশব্দ নেই কেনো!

- নৈঃশব্দের ভাষা নিশ্চয়ই বোঝো!

   তবু না বোঝার ভান প্রহসন লাগে এ অধমের। 


- আমি এমনি। পোষাবে? 

- বঁড়শি যে নিয়ে গেছি পাকস্থলীতে। 


- এখন? বোঝো মজা। মনে আছে, কবি'র সে-ই ভাব?

 "প্রেম খুবই বিরক্তিকর। সংসারও স্বশ্রম যাবৎজীবন

  পুতুপুতু কথার ন্যাকামী। দেবী বন্দনার চেয়েও জটিল

   স্তুতি পাঠ।" আরো কতো কি!

- কবিমন তো এমনই!

   কখনো নির্লিপ্ত, কখনো স্বেচ্ছায় আত্মাহুতিতেও রাজি।


- এখন উল্টিয়ে বলো কথাগুলো? বলো?

- এ-যে প্রতিশোধ প্রবণতা! প্রয়োজন আছে কি?


- আছে। বলো? বলতেই হবে। এখনি বলো?

- ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি।



লেবেলসমূহ: