মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৩

বিরহের কবিতা - ১



১.

ডিমেনশিয়া 

এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

ঝাপসা সে চোখের মায়া, ঝাপসা সে মুখ

তিলগুলো যেন কোথায় কোথায়

মনে পড়েও পড়েই না যেন!


বুকের কোথায় যেন দাগ হয়েছিল

কোথায় যেন বাঁধ ভেঙ্গেছিল

উপর না নীচ কতোটা ফুলেছিল

রক্ত গড়িয়েছিল ঠোঁটের কোন্ কোন থেকেও

সব কিছুই মনে করতে পারি না।


ভদ্রলোকেরা তো জোর করেই ভুলে থাকে

ঐশীগ্রন্থ মাথায় নিয়েও কতো

অবলীলায় নিখুঁত করে মিথ্যে বলে

সচল রাখতে বর্তমান করবেই বা কী!

চারপাশ ঘিরে এতো অস্থিরতায়

প্রায়ই বোধ হারায় মানুষ।


আমি আবার অমন না, এইখানেতেই

অন্যদের চেয়ে চালাক বোধয়

কেমন করে মুঠোফোনের সংখ্যা ভুলেছি

ভুলেছি অসামান্য কতোকিছুর দিনক্ষণ

কেমন করে, কিভাবে যেন, মনে নেই!


আমি একটু কেমন যেন

এক থেকে দশে থাকি না, একেবারেই নিরানব্বই

আর এক হলে একশো হতো

আর এক মিলতে মিলতে মেলেই না শেষে

একদিন নিভে গেলে একশো বিয়োগ একশো

ফের শূণ্য হতো, অথবা প্রকৃতির খেয়ালে

ফের মনু বা আদম হতো।


এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

কিছু মানুষ কেনো যে তাও

হঠাৎ হঠাৎ তোমার কথা বলে!



২.

ভালোই আছো

বেশ তো ভালোই আছো

দিন কি রাত রুটিন করে ক্রাশ খাচ্ছো

চার রঙে ছবি ছড়াচ্ছো নেট দুনিয়ায়

রিঅ্যাক্ট আর কমেন্টের মরীচিকায়

মাগজিক শ্রমে ঝড়াচ্ছো ঘাম

নিয়ে ভরপুর ব্যস্ততা।


আধুনিক মানুষিকতা মানুষের চেয়ে

যন্ত্র ভালোবাসে বেশি

কান্না-হাসি-শিৎকারের মতো প্রাকৃতিক

আওয়াজ কি ভঙ্গিতেও আনে আধুনিকতা।


কেমন সেকেলে ভেতর-বাহির নিয়ে

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দু'পলক তাকাতেও

কেমন যেনো ঠকবাজ লাগে নিজেকে।

চলন্ত ছবির মতো ভেসে ওঠো কেবল

মন বলে ওঠে, তুমিই সুন্দর।


বেশ তো ভালোই আছো,

'ভালো আছো' ভাবতেও ভালো লাগে।



৩.

উড়ো কথা 

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।

মাঝে মাঝেই নাকি আসো এদিকে?

কোথায় কোথায় যাও,

সঙ্গে কে কে থাকে?

রিক্সা পছন্দের বাহন ছিলো,

এখনো কি তাই?

আমার হাত ধরে চিনেছিলে যে শহর

ভোর-বিকেলের স্নিগ্ধ প্রতিবেশ

সকাল-সন্ধ্যার ব্যস্ততা, ভীড়, জ্যাম

ঢিলেঢালা জামার মতো ফ্রি-স্টাইল দুপুর 

নিয়ন আর সোডিয়াম আলোয় মোহনীয় রাত

এখনো তেমনি বরং জমকালো আরো।

তুমিও ঢের সম্পূর্ণ এখন

তাই কখন আসো, কখন যে যাও

বোধয় পাখিরাও জানে না ঠিকঠাক, তবু

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।



৪.

ক্ষোভের গ্রাফিতি

তোমার ছবিগুলোও কথা বলে

মুছে ফেলছি তাই

চৈনিক শিল্পকারিগরের কাটা হাতের

অক্ষমতার অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকি

বারে বারে মনে হয়

এ শহরে তুমি আর নেই!

জোর করে ভুলে থাকি

জ্যামিতিক জীবন, বিগতক্ষণ

ভেতরে তখন, একলা কপোত

আপন মনে কোন্ খেয়ালে

দু'পায়ে মাটি নিঙড়ায়

অক্ষম ক্ষোভে গ্রাফিতি আঁকে!



৫.

দেখা নেই আজকাল

আমাদের দেখা নেই আজকাল

দিনদিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছো

তন্দ্রার ভেতর,স্বপ্নের ভেতর

ঘুরে ফিরে অসম্পূর্ণ চিত্রকল্পই সার!


নিজের সাথে নিজেই বেইমানী করে

তুমি কি দূরে সরে যাচ্ছো?

মাঘের কনকনে বাতাসের মতো

লাগে তোমার কথার ঝাপটা

কেমন অচেনা গন্ধ ঢাকো দামী পারফিউমে

এক সময় তোমার শরীর জুড়ে

থাকতো নির্মোহ সবুজের ঘ্রাণ

ছিল সমানুপাতিক ভালোবাসাময় মন

যে মন বিকাতো না অন্য কোথাও

কোথা থেকে কী হলো আজকাল!


চিলের চোখ নিয়ে ঘুরে টিকটিকি স্বজন

আমাদের আর দেখা নেই আজকাল।



৬.

কোন এক সাবিত্রী কে

শোন্ সাবিত্রী, তুই আসার আগেই 

জেনেছি, 'সত্যবান' বড্ড বেমানান এখন 

আর 'হরিসচন্দ্র' মীরাক্কেলীয় 'নন-ভেজ' 

তবু একগুঁয়ে বুমেরাং মন 

ভিন্ন ভিন্ন পাঠশালায় অভিন্ন পাঠে 

আজ দৃঢ়, আধপোঁড়া, চোঁখা তীর 

অগুন্তি অনুরাগে বোনা সোনালী জালের

মোহ ছেড়ে 

একবার যদি বেরোয় 

শারদ দেবীর কসম, অকাল বোধনেও কিচ্ছু হবে না।



৭.

স্বজন আগুন

সেই যে জেনেবুঝে ধাক্কা দিয়েছিলে

এক গ্রহসম জলজ্যান্ত আগুনে,

পুড়েছি নির্দয়ের মতো শুশ্রুষাহীন

বাধ্য হয়েই শ্রাবণ কি ফাগুনে।


শেষে আগুন এখন স্বজনের মতো

আর সেই আমিটা ফিনিক্স হয়ে উড়ি,

আগুন দেখলে ঝাপ দিই

অবলীলায় আগুন পান করি।


পোড়াই বাহির-ভিতর অকৃত্রিম উল্লাসে 

আক্ষেপ হয়ই না এখন,

ইচ্ছে স্বাধীন এমনিই পুড়ি

পুড়তে ভাল্ লাগে ভীষণ!



৮.

শুনছো কি

আমিও তীর্থের কাকের অপেক্ষা নিয়ে 

ময়ূর পুচ্ছের অগুনিত চোখে

চাতক মনে বসে থাকি,

সময়ের প্রবাহে ঋতু পাল্টায়

আর তুমি যে কোথায়

কোন্ খেয়ালে অবসরের ব্যস্ততায়

আমার দিনলিপিতে পড়ে না চোখ!

ঘুমে কোন্ মেঘের মরীচিকায় আঁকছো হাবিজাবি 

যথেষ্ট হলো না কি?

থিতু হও প্রিয় এ হৃদয়ে

নেড়েচেড়ে দেখো, এখানেও 

অমানিশার পরে জোছনায় ভাসে

ক্ষরার পর প্লাবনে সিক্ত হয়

শিশির বিন্দু হিরণ্ময় দ্যুতি ছড়ায়

পাখির আবাহনে বসন্ত বয় তবু

কোন্ মোহের ঘুমে কাতর থাকো?

জেগে ওঠো প্রিয়, দেখো

সত্ত্বাধিকারী বিহীন হৃদয় প্রকোষ্ঠের অনন্য স্থান 

ধূপ ধোঁয়ায় মেঘের রাজ্যপাট এঁকেছে!

মোহের ঘুম ছেড়ে উঠে এসো 

উঠে এসো প্রিয়, 

ডাকছি ভীষণ, শুনছো কি?



৯.

বিবাদী

বেঁচে থাকার কমছে বয়স এখন

জমছে মেদ এদিক ওদিক

টান্ হারাচ্ছে ত্বক

টানছে হাত প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন।


টাটায় খুব চোখ দুটিতে

গর্ত হচ্ছে দাঁতে

কালি জমছে ফুসফুসে

হৃদপিণ্ডে বাড়ছে বর্জ্য আয়েশে

পাকস্থলি অনিয়মের ভাগারে

যাপিত জীবন খেয়ালের রথে চড়ে

কসরতহীন অঙ্গাদি ডেকে ডেকে

বাধ্যতামূলক করছে ঔষধকে।


আক্ষেপ এভাবে পেড়িয়ে যাওয়ায়

রাখিস্ না যে খবর

বুকের চিনচিনিয়ে ব্যাথায়

বিবাদীর নাম কিন্তু তোর।



১০.

ঊনপঞ্চাশ বায়ু

পুকুর ভালোবাসলো এক শঙ্খচিলকে। এক গ্রীষ্মে সে সমুদ্র পেরুতে গিয়ে ঝরের কবলে পড়ে কোথায় যে মিলিয়ে গেল কেউ জানে না! সেইথেকে পুকুরের সমুদ্র ছোঁবার বাসনা। কি কি করে একদিন নিমন্ত্রণ করে আনলো এক ইঁদুরের পাল। ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে থামলো। সেবারই বর্ষায় গর্ত দিয়ে পুকুর গিয়ে নদীতে মিশলো। তারপর ছুটলো সমুদ্রের দিকে। মোহনায় গিয়ে খবর পেল, সমুদ্রের সেই জলেরা উবে গিয়ে হিমালয় ঢেকেছে। সূর্যের অনুগ্রহে সেও উবে হিমালয়ে গিয়ে দেখে, হিমালয় ঢেকে দেয়া সেই বরফের দল গলে গলে অসংখ্য ছরার সমাহারে নদী হয়ে ছুটছে সমুদ্রের পানে।

সেও ছোটে কখনো নদী থেকে মোহনা, মোহনা থেকে সমুদ্র, সমুদ্র থেকে হিমালয়। তবু আর ছোঁয়া হয় না। শেষমেষ প্রত্যাবর্তন স্বস্থানে। দিনরাত্রি তার বুকে ভাসে নক্ষত্রেরা, খেলা করে রোদ্দুর, জোছনা, ডুব দিয়ে যায় কতোকিছু; শুধু ...। 



১১.

ব্যস্ততা

ইষ্কাপনের বিবি'র ভাব তোমার শরীর জুড়ে

তবু তোমার কাছে গিয়ে বারংবার 

খুবকরে সুখ ভরে নিতে ইচ্ছে করে।

অথচ কী সাংঘাতিক ব্যস্ততা তোমার!


আহা! ব্যস্ততা, নিপুণ ঘাতক ব্যস্ততা 

আমাকে ভুলিয়ে দেয়া ব্যস্ততা,

জয়ের পতাকা তোমার মধ্য দুপুর

কি রাতেও পত্ পত্ করে ওড়ে!


ব্যস্ততাহীন বন্ধ ঘড়ি আমার হাতে

তোমার বিরামহীন! 

হায় ব্যস্ততা! তোমার আবরণে ঢেকে

আমি হই শেষ শয়ানে কমরেড।



১২.

প্রতিশোধের শব্দেরা

‌তোমার হৃদ‌য়ে পরগাছার স্থায়ী ব‌ন্দোবস্থের 

বায়বীয় দ‌লিল মা‌ড়ি‌য়ে 

অনুগ্রহতুল্য বিকলাঙ্গ অথবা খুন ক‌রে 

‌বিদায় নেব সব থে‌কে 

পাপী দে‌হের পা‌শে 

প‌ড়ে থাক‌বে জবানবন্দী 

প্রণয় বেড়ুবে গোপন বেডরুম কালচার ছেড়ে

‌কিছু মানুষ শুধ‌রে নে‌বে নি‌জে‌দের 

সাদা ফু‌লের গ‌ন্ধে শো‌ভিত পৃ‌থিবী  

তখন আ‌মি অথবা আমরা বিহীন ।



১৩.

নিখোঁজ 

তারপর তার আর খোঁজ নেই 

কত পূর্ণিমায় সরীসৃপেরা সঙ্গমে মাতলো

কাকের বাসায় কত ছানা ফুটলো কোকিলের

কত বর্ষার অলস সময়ের ভালোবাসা জানান দিতে 

গ্রীষ্মে চোখ মেললো কত মানব শিশু 

কত ফুল ঝরে গিয়েও

মধুর পাত্রে রেখেছে তার অস্তিত্ব 

তবু খোঁজ মেলেনি তার 

কারণে-অকারণে খুঁজছি কতই

খোঁজ মিলছেই না কিছুতে

তবু কেন যে লোকে বলে,

খুঁজলে নাকি মেলে। অথচ

সেই মনের অভিব্যক্তি দেখা হচ্ছেই না আর!



১৪.

শাশ্বত বর্তমান

তোর স্মৃতিচিহ্নের মতো কষ্টগুলো

ড্রয়্যারে তালা এঁটে

দিব্বি উড়িয়ে দিই সময়।

ড্রয়্যার ফেটে ফুল কি কীট

বেরুলে বেরুক, ভাবি না।

অতীত বা ভবিষ্যতের জন্যও না।

প্রতি মূহুর্তে অতীত হয়ে যাওয়া

বর্তমান নিয়েই বাঁচি।


লেবেলসমূহ:

0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]

<< হোম