ছোটগল্পেরা - ১
১.
একটি সেমি-লাভ স্টোরি
আজ পকেটে দশ'টি টাকা মাত্র। অমল দ্বিধার আবর্তে এপাশ-ওপাশ করছে। ওই টাকায় ব্রীজ অব্দি ইজিবাইকে যাবে, না একটা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে হেঁটে যাবে।
দেবলীনা বড্ড টানছে আজকাল তাই প্রায় রোজ ছুটে যায় তার এলাকায়। পাশের চা-স্টলে চা খায়, গল্প করে, সাথে সঙ্গ দেয় কামরুল। সেজন্যই হাত খরচের টাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রাপ্তি বলতে কোনদিন দু-একবার চোখাচোখি, কোনদিন হয়ই না। এখন অব্দি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি ক'বার সুযোগ পেয়েও। না পরেছে অন্যকোন মাধ্যমে। অমলের দৃঢ় বিশ্বাস, দেবলীনা তার মনের কথা বোঝে। এমনি সেকেলে এক প্রেম প্রেম আবহে অমলের দিব্বি যাচ্ছে।
ক'সপ্তাহের এই সেমি-লাভ স্টোরির ইন্টারভেলের আগেই হঠাৎ আজ জেনেছে দুঃসংবাদ। দেবলীনার বাবা চাকরিতে পদোন্নতি জনিত বদলি হচ্ছে। গোছগাছ প্রায় সাড়া, ভোরেই চলে যাবে। সারাটাদিন বসে আর পাক পেড়ে পরন্ত বিকেলে কয়েক পলকের চোখাচোখি। অমলের জল জমে ওঠা চোখে দেবলীনার চোখমুখের অভিব্যক্তি ঝাপসা হয়ে যায়।
ক'দিন ধরে বিকেলে আর বের হতে ইচ্ছে করে না অমলের। নিজের কামরায় যেন দেবলীনাদের গোটা এলাকা এসে বসে থাকে। বিকেল ধীরে ধীরে আঁধারে মিশতে শুরু করলে অমল জানালার গ্রীল ধরে দাঁড়ায়। তখন জ্বলে ওঠা শহরের গুচ্ছ গুচ্ছ আলোর প্রতিফলন ভেজা চোখ দুটিকে হার মানিয়ে দেয়। দূরের একগুচ্ছ আলোর মাঝে যেখানে একটু নীলচে আলো, সেখানেই যেন প্রতিচ্ছায়া ভাসে দেবলীনার।
এদিকে পাশের অন্য জানালায় তখন সদ্য কৈশর পেড়ুনো তরুনী মোহ আবিষ্ট, চড়ুই পাখির তিড়িং বিড়িং এ কাটায় অবসর।
জানালা ছেড়ে অমল লেগে পড়ে বাধ্যতামূলক রোজকার কাজে। সব সেরে আবার দাঁড়ায় জানালায়। রাত গভীরে যায় আর নিভতে থাকে বাড়িগুলোর ভেতরের বাতিরা। ক্ষীণ আলোয় মানুষেরা আনন্দে মাতে, সুখের নিদ্রা দেয় অষুধ খেয়ে। সবাই তবু কেমন করে যেন কম-বেশি ভালোই আছে। অমলের মন হয়, এইসব ভালো থাকা দেখে দেখেও ভালো থাকা যায়।
২.
পুড়িয়া
শরীর হাতড়ে কিছু খোঁজার চেষ্ঠা করছে একজন পুলিশ। দুইজন শতর্ক চোখে তাকিয়ে আমার দিকে। আর একজন প্রশ্ন করে চলে আর আমি উত্তর দিয়ে যাই।
বাসা কোথায়?
সামনেই।
কোথা থেকে আসছেন?
শম্ভুগঞ্জ থেকে।
কি করেন ?
অর্থ উপার্জন হয় এমন কিছু করি না।
নাম কি?
নাম বলতে যাচ্ছি অমনি আমার পাঞ্জাবীর ডান পকেট থেকে সাদা কাগজের একটা ছোট পুড়িয়া বের করলো পুলিশ। আমি নির্বিকার, পুলিশের চোখ যেন বিস্ফোরিত! ভাবের সাথে জিজ্ঞেস করে,
এই বেটা, ক-যে বেকার। অতো ভাব চোদাস্ ক্যান?
আমি তখনো নির্বিকার। পুড়িয়া'টা হাতে চেপেই সব বুঝে ফেলার অভিব্যক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
কই থেইকা আনছস্?
শম্ভুগঞ্জ থেকেই।
কার থেইকা আনছস, নাম ক'?
হাসান।
নাম্বার দে।
এর সাথে হাসানের নাম্বার দেবার কী সম্পর্ক?
দুইডা থাপ্পর লাগাইলেই বুঝবি। নাম্বার দে।
অন্যজন বলে, তোমার নাম্বার থেইকাই কল দেও।
নাম্বার চাপতেই মোবাইল ফোন কানে লাগায় আগেরজন। ওপাশ থেকে হাসানের কন্ঠ,
দাদা কও।
দাদা না, পুলিশ। তোর নাম হাসান?
জী। কী হয়েছে দাদার?
এইটা দেখার জন্য এখনি ব্রীজে আয়, নয়তো পাঁচ মিনিট পরে বাসার লোকসহ তোরে ধইরা নিয়া আমু।
করলাম'টা কি বলবেন তো?
ঐ..., তোরে যেইডা কইছি হেইডা কর।
বলে লাইন কেটে দেয়। ফের হাসানের কল। আমি কেটে দিই। ২ মিনিট পর মোবাইল ফোনে এস.এম.এস. আসে হাসানের। জানায়, আমি ছোটন আর বাদল ভাই'কে নিয়ে আসতাছি। ছোটন ভাই কইছে কোনো সমস্যা হবে না, ওয়েট।
এর মাঝেই একজন পুলিশ জিজ্ঞেস করে,
কবে থেইকা খাস?
কি?
ভদ্রভাবে কইতাছি তো, কানে বাতাস ঢোকে না! কয়েক'টা লাগাইলেই ... !
ভাই, কোথাও ভুল হচ্ছে। বিষয়'টা...
বিষয়'টা তোর কাছ থেইকা বুঝতে হইবো? বিরাট মুসুল্লি ভাব ধরছস, ভাবছস কিছু বুঝিনা? এই, এ্যারে হাতকড়া লাগান।
এর মাঝেই মজনুর ফোন। একটু সময় চেয়ে ফোনটা ধরি,
আপনি এখনো ব্রীজে?
হ্যাঁ।
মঞ্জিল'রে নিয়া ওর বাইকে আইতাছি। বাইকের কাগজ হয় নাই, তাই মঞ্জিল ব্রীজের এই পাড়েই থাকবে। ব্রীজ হাঁইটা পার হইতে হইবো তাই ৫ মিনিট দেরী হইতে পারে।
আচ্ছা।
ফোন রাখতে রাখতেই শহীদের কল,
ভাই, একদম টেনশন কইরেন না, ঘটনা বাসা পর্যন্ত যাইতে দিমু না, কিছু টাকা ম্যানেজ করে আসতাছি। আর কারো নাম কন নাই তো? প্লিজ ভাই!
আরে নাহ্। রাখছি তাহলে।
কয়েক গজ দূরে উৎসুক জনতার ভীড় বাড়ছে, ফিস্-ফাস্ টের পাচ্ছি।
প্রথমজন পুড়িয়াটা হাতে নেয়, ধীরে ধীরে খুলে এক পলক তাকিয়ে হাত মুখের সামনে তোলে, অন্য হাতের দু'আঙ্গুলে ঘসে জিজ্ঞেস করে,
কী এইটা?
দেখেন না, কি?
অতিভাবের জন স্বজোড়ে জিজ্ঞেস করে,
মানে?
উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের হাতে সেও পরখ করে। চেহারার অভিব্যক্তি দ্রুত বদলে যায়। আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
আগে বলবেন না! অযথা সময় নষ্ট করলাম, আমরা দুঃখিত।
ইটস্ ওকে। আমার প্রেমিকা দেখলেও এমনি ভাবতো।
হাসানের কল,
দাদা, আজ তো তোমার কাছে কিছু নাই! তো পুলিশ ধরছে ক্যান?
স্টেজে ওঠার আগে তুই যে অবশিষ্ট জরির পুড়িয়া'টা আমার পাঞ্জাবির পকেটে রেখেছিলি, ওটাকে অন্যকিছু ভাবছিলো। সব ঠিক হয় গেছে, তোদের আর আসতে হবে না।
৩.
টকবক, টকবক, টকবক...
৭৪ পেড়ুনো জমিলা টকবক, টকবক বলতে বলতে হঠাৎ বোকাবনে যায় নিজের বোকামি দেখে! তার নাতি রইসউদ্দীন ঘুমে আধমরা, তিনি অযথা টকবক-টকবক করে গেছেন!
নাতির কেবল যুবরাজের কিচ্ছা ভাল্ লাগে। প্রতাপশালী রাজার পুত্র, দেখতে সুদর্শন, রাগ আর কোমলতায় মেশানো ব্যক্তিত্ব, তার জন্যে পাগল রাজকন্যারা, অন্যরা দেখলেও ধন্য মনে করে নিজেদের, তার উদীয়মান বীরত্বের কথা অবগত সবাই!
জমিলা মনে মনে ছুটির কথা ভাবে। একদিন রইস্ আরো বড় হবে, জমিলা আর ঘুমে প্রায় ভেঙ্গে পড়া চোখ নিয়ে রাজপুত্রদের কিচ্ছা শোনাতে হবে না, ইচ্ছেমাফিক ঘুমাতে পারবে! আবার তার মনে হয়, এই বাৎসল্যের সুখটা তো তখন আর পাওয়া যাবে না।
যুবরাজের কিচ্ছাশোনা রইস্ কৈশরে এসেই ধাক্কা খায় বাস্তবতার। দেখে অনেক কোটালপুত্রের মতো সে, অন্য ক'জন রাজপুত্র প্রায়! মনটা ভেঙ্গে ফাঁক হয়ে থাকে! গোটা কৈশর পেড়িয়ে যৌবনের মাঝখানে এসেও দেখে কোটাল পুত্রই সার! অনেক-অনেক হিসেব কষে শেষে সে বোঝে- 'যুবরাজ' এক অসম্ভব কল্পনা!
ভেঙ্গে পড়া ভাবনার আকাশ ভারী কোরে তোলে তার মাথা, একদিন সহ্যাতীত হয়ে পড়ে আচমকা!
অচেনা বসন্ত বয়ে যায় আটবার। এক ভোরে বাজারের লোকজন দেখে- একটি বাঁধা গাধার পাশে শুয়ে এক পাগল প্রায় মানুষ!
বেলা বাড়ে, আশেপাশের গ্রামে রটে যায়, শেষে আবিস্কৃত হয়, এই পাগল প্রায় লোকটি 'রইসউদ্দীন'।
রইস্ চিনতে পারে অনেককেই, যেচে কথা বলে না, উত্তরও দেয় অল্প কথায়, তাও কখনো সখনো।
পরিবারের লোকজন বাড়িতে নিয়ে যায়। ইচ্ছেমাফিক কাজে সহায়তা করে চুপচাপ থেকে। কারো সাথে মেশে না। ভোর থেকে বিকেল কাজ করে কতোকিছুই। গোসল, খাওয়া সেড়ে ঢুকে পরে ছোট্ট ঘরে। সন্ধ্যার পর তার গাধার পিঠে চড়ে বেড়িয়ে পড়ে ইচ্ছে মতো। একেকদিন একেকদিকে, কোনো কোনো পথে টানা কয়েকদিন... ! আশাপাশের সবাই জানে 'টকবক' শব্দের উৎস।
পরিচর্যাহীন দাঁড়ি-ঘোঁফ-চুলের তমাটে প্রায় বর্ণের আধপাগল রইসউদ্দীন যাচ্ছে গাধা ছুটিয়ে। রইস্ গাধার পিঠে ওঠেই ভুলে যায় অন্যকিছু! তার দাদীর মুখে শোনা যুবরাজের কিচ্ছা ছাড়া যেনো আর কিছু নেই! রইসউদ্দীনের ভেঙ্গে চৌচির মন যুবরাজ হয়ে ওঠে তখন! প্রতাপশালী রাজারপুত্র, দেখতে সুদর্শন,,রাগ আর আর কোমলতায় মেশানো ব্যক্তিত্ব, তার জন্যে পাগল রাজকন্যারা, অন্যরা দেখলেও ধন্য মনে করে নিজেদের, তার উদীয়মান বীরত্বের কথা অবগত সবাই!
রইসউদ্দীন গাধার পিঠে ছুটছে টকবক, টকবক, টকবক, টকবক...!
৪.
আপেল হাতে পাহাড়ি মেয়ে
ছোটবেলায় তখন সবে ভেঙে ভেঙে শিশুতোষ গল্পের বই পরতে শিখেছে কাঞ্চন। নিজে নিজে প্রথম পড়া গল্পটি কিছুটা এমন যে, এক কিশোর স্কুল বন্ধের সময়টাতে বেড়াতে যায় এক পাহাড়ে। সেখানে পরিচয় হয় একটি পাহাড়ি বালিকার সাথে। সেই বালিকা তার হাতে আপেল দিয়ে সম্ভাষণ জানায়। ছবির মত চমৎকার ক'টা দিন কাটিয়ে ফিরে এসে তার বন্ধুদের সাথে গল্প করে। তার মতো তার বন্ধুদেরও ইচ্ছে জাগায় সেই পাহাড়ে বেড়াতে যাবার।
তারপর গল্পের সেই কিশোর কিংবা তার বন্ধুরা সেখানে গিয়েছিল কিনা তা অনেকের মতো কাঞ্চনেরও অজানা। অন্য যারা ঐ গল্পটি পড়েছিল তারা ক'জন সেই পাহাড়ে গিয়েছিল কিনা, গেলেও সেই পাহাড়ি মেয়েটির দেখা পেয়েছিল কিনা তার পরিসংখ্যানই বা কে রাখে।
তবে সেই থেকে কাঞ্চন মনে মনে চিত্রকল্প আঁকে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে স্কুল বন্ধ হবে, সেও বেড়াতে যাবে পাহাড়ে। খুঁজে বের করবে পাহাড়ি বালিকা’কে। পাহাড়ি বালিকা তার হাতে আপেল গুঁজে স্বাগত জানাবে। পাহাড়ি বালিকা ঘুরে ঘুরে পাহাড় দেখাবে, খেলবে, ছড়া শোনাবে, গান শোনাবে, আরও কত কি।
পরীক্ষা শেষ করে কাঞ্চন বাবাকে গল্পের সেই বই দেখিয়ে গোঁ ধরে ঐ পাহাড়ে নিয়ে যেতে। বাবা, গল্পটা পড়ে জানায় এটা একটা বিদেশি গল্প। ঐ পাহাড়টা অনেক দূরের অন্য দেশে, সেখানে তাদের পক্ষে যাওয়া সম্ভব না। কে শোনে কার কথা, কাঞ্চন সেখানে যাবেই। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে কান্নাকাটি। কোনভাবেই মানানো যাচ্ছে না দেখে বাবা দারস্থ হলেন স্কুলের এক দিদি মনির। সব শুনে কতগুলো আপেল নিয়ে দিদিমনি উপস্থিত হলেন। কাঞ্চনকে বললেন তিনি তাকে নিয়ে যাবেন কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ওখানে যেতে অনেক সময় আর টাকা লাগবে তাছাড়া খুব ঠান্ডা আবহাওয়া সেখানে। সে আরেকটু বড় না হলে যাওয়া সম্ভবই না। তাই ভালো করে খাওয়া-দাওয়া ও খেলাধুলা করে বড় হতে হবে সেইসাথে ভালো করে পড়ালেখা করে বৃত্তি পেতে হব। তারপর বৃত্তির টাকা দিয়ে সেই পাহাড়ে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। আপেল খেতে খেতে কাঞ্চনের মনে হলো দিদি মনির কথাই ঠিক।
দিন গড়িয়ে বছর আর একটা করে স্কুলের ধাপ ডিঙিয়ে প্রাথমিকে বৃত্তি পেল কাঞ্চন।
প্রিয় পাঠক কি ভাবছেন, কাঞ্চন এবার সত্যি সত্যি সেই পাহাড়ে যাবে?
যে কথাটি বলা হয়নি, ততদিনে কাঞ্চন আরও অনেক গল্প পড়ে আর চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতিতে বুঝে গেছে গল্প আর জীবনের ফারাক।
কাঞ্চন এখন তরতাজা যুবক। পাহাড়ে যাবার জন্য আর গোঁ ধরে না। বাকিরা সব ভুলেই গেছে সেসব কথা।
কিন্তু কাঞ্চন মাঝে মাঝে একটা স্বপ্ন দেখে, ঘুমের ভেতর ছোট্ট নদী, তা পেড়িয়ে নীচু বন। এরপর এলোপাথারি ক্ষেত, জঙ্গল তারপর আঁকাবাঁকা টিলা মাড়িয়ে নীলাভ কালচে সবুজ পাহাড়। বিশেষ দিকে পায়ে হাঁটার রঙিন পথ। মাঝপথে আপেল হাতে একটি পাহাড়ি মেয়ে ডাকছে, "এদিকে আসো, আসো এদিকে, আসো, আসো..."।
লেবেলসমূহ: ছোটগল্প


0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম