ছোটগল্পেরা - ২
১. করাপশন লিমিটেড
শহরের মাঝখানে এক বিশাল ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের নাম- 'জাতীয় করাপশন উন্নয়ন কর্পোরেশন'। সংক্ষেপে সবাই বলে, 'জাকউকো'। ভবনের নিচে বড় অক্ষরে লেখা-
"সততাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।"
প্রথম দিন চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে আহসান সাইনবোর্ড দেখে থমকে দাঁড়ালো। সে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা এক তরুণ। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে মানুষ হবে। মা বলতেন, সৎ থাকতে, তবেই নাকি শান্তি থাকতে জীবনে।
কিন্তু চাকরির বাজারে শান্তির কোনো বিজ্ঞাপন ছিল না। ছিল কেবল অভিজ্ঞতা, সুপারিশ, খাম, পরিচয়, নীরবতা, অন্যান্য আরও কিছু।
আহসান রিসেপশনে গিয়ে বললো, আমি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
রিসেপশনিস্ট মিষ্টি হেসে বললো, অভিনন্দন। কোন বিভাগে?
আহসান বললো, জনসেবা শাখা।
রিসেপশনিস্ট তরুণী মৃদু হেসে বললো, ওটা আমাদের সবচেয়ে লাভজনক বিভাগ। মানুষ যত বেশি সেবা চায়, আমরা তত বেশি আয় করি।
আহসান একটু অবাক হয়ে ধীরে ধীরে বললো, কিন্তু সেবা তো জনগণের অধিকার।
রিসেপশনিস্ট এবার গম্ভীর হয়ে বললো, দেখুন- এখানে অধিকার বলে কিছু নেই। এখানে সবকিছু প্যাকেজ। এই বলে একটি ব্রোশিওর এগিয়ে দিল। তাতে লেখা-
সেবা প্যাকেজসমূহ:
সাধারণ প্যাকেজ: ফাইল হারিয়ে যাবে।
সিলভার প্যাকেজ: ফাইল পাওয়া যাবে, কিন্তু সই হবে না।
গোল্ড প্যাকেজ: সই হবে, তবে তারিখ ভুল হবে।
প্লাটিনাম প্যাকেজ: সব ঠিক হবে, তবে স্রষ্টার আশীর্বাদ ও নগদ সহযোগিতা প্রযোজ্য।
আহসানের মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা! তবু সে নিজেকে বোঝালো, ভেতরে গিয়ে দেখি, হয়তো ভুল বুঝছি।
কিন্তু ভেতরে গিয়ে সে বুঝলো, ভুল সে করেনি; বরং দেশই অনেক আগেই ভুলকে নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে।
সেদিনই অরিয়েন্টেশন ক্লাস শুরু হলো। প্রশিক্ষকের নাম আজহার সাহেব। তিনি ত্রিশ বছর ধরে করাপশন শিল্পে কর্মরত। তার কণ্ঠে অভিজ্ঞতার ভার, চোখে সফলতার তেলতেলে দীপ্তি।
তিনি বললেন, তোমরা যারা নতুন এসেছো, মনে রেখো- ঘুষ নেওয়া কোনো অপরাধ নয়, যদি সেটাকে সুন্দর নামে ডাকা যায়। ঘুষ শব্দটা অশ্লীল। আমরা বলি- সম্মানী, সহযোগিতা, চা-নাস্তা, মিষ্টিমুখ, ফাইল-গতিশীলতা ফি।
একজন প্রশিক্ষণার্থী হাত তুলে অনুমতি নিয়ে জানতে চাইলো, কেউ যদি টাকা না দেয় স্যার?
আজহার সাহেব হেসে নিয়ে বললেন, তাহলে বুঝবে লোকটি অসামাজিক। তাকে সময় দিতে হবে। ফাইলকে একটু বিশ্রাম দিতে হবে। ফাইলকে যে পরিচালিত করে- সে তো মানুষ, তারও ক্লান্তি আছে।
সবাই হেসে উঠলো। আহসান হাসতে পারলো না।
দুপুরে তাকে একটি টেবিল দেওয়া হলো। টেবিলের ওপর তিনটি সিল।
প্রথম সিলে লেখা- 'প্রক্রিয়াধীন'
দ্বিতীয় সিলে- 'অপূর্ণ কাগজপত্র'
তৃতীয় সিলে- 'উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তাধীন'
পাশের কর্মকর্তা কানে কানে বললেন, এই তিনটি সিল দিয়েই দেশ চলে।
বিকেলে এক বৃদ্ধ এলেন। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো ফাইল। তিনি বললেন, আমার পেনশনের কাগজটা ছয় মাস ধরে আটকে আছে। একটু দেখবেন?
আহসান ফাইল খুললো। সব কাগজ ঠিক আছে। সে বলল, আপনার কাজ হয়ে যাবে।
বৃদ্ধের চোখে পানি এসে গেল। আবেগ সংবরণ করে বললেন, আপনার মঙ্গল হোক।
আহসান ফাইলে সই করতে যাবে, এমন সময় পাশের কর্মকর্তা তার হাত চেপে ধরে বললেন, এভাবে নয়। আগে ফাইলের মন বুঝতে হয়।
আহসান আবাক হয়ে বললো, ফাইলের মন?
সহকর্মী কর্মকর্তা বললেন, হ্যাঁ। ফাইলের মন খুব সংবেদনশীল। একটু তেল না দিলে চলে না।
বৃদ্ধ সব বুঝলেন। পকেট থেকে কাঁপা হাতে এক হাজার টাকার দুইটি নোট বের করে বললেন, আমার কাছে এতটুকুই আছে।
আহসানের বুক ধক্ করে উঠলো। সে নোট দুটোর দিকে একপলক তাকিয়ে বললো, কোন টাকা লাগবে না।
অফিস হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল! যেন কেউ জাতীয় সংগীতের মাঝখানে হাঁচি দিয়েছে।
আজহার সাহেব দূর থেকে ডেকে বললেন, আমার রুমে আসো তো আহসান।
আহসান রুমে ঢুকতেই আজহার সাহেব দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, তুমি কী করেছো জানো?
আহসান বললো, আমি একজন বৃদ্ধের কাজ করেছি, স্যার।
আজহার সাহেব বললেন, না। তুমি সিস্টেমের অপমান করেছ।
আহসান বললো, সিস্টেম যদি অন্যায় হয়?
আজহার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি এখনো তরুণ। ভাবছো- সততা দিয়ে দেশ পাল্টাবে। এই দেশে সততা হলো এমন এক রোগ, যার চিকিৎসা সমাজ নিজেই করে নেয়। কেউ বেশিদিন আক্রান্ত থাকে না।
আহসান চুপ করে রইলো।
পরদিন অফিসে এসে সে দেখলো তার টেবিল বদলে গেছে। তাকে পাঠানো হয়েছে 'নৈতিকতা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনী শাখা'- তে।
এই শাখা ছিল ভবনের পেছনে, জানালাবিহীন ছোট ঘরে। ঘরের মাঝখানে কাচের বাক্সে রাখা একটি পুরোনো বস্তু। নিচে লেখা-
'সততা: বিলুপ্তপ্রায় প্রশাসনিক উপাদান।'
মাঝেমধ্যে নাকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে আসে। সেদিন গাইড শিক্ষার্থীদের দেখিয়ে বলে, একসময় এই দেশে সততা পাওয়া যেত। মানুষ টাকা ছাড়াও কাজ করত। এখন এটি জাদুঘরে সংরক্ষিত।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জিজ্ঞেস করলো, সততা কি খাওয়া যায় আঙ্কেল?
গাইড বললো, না। তাই তো টেকেনি।
আহসান কাচের বাক্সের পাশে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে মনে হতো, বাক্সের ভেতরে বস্তুটি নড়ছে। যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেন এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি।
একদিন দুপুরে জরুরি ঘোষণা এলো।
"রাষ্ট্রীয় করাপশন শিল্প মেলা শুরু হতে যাচ্ছে। সকল বিভাগ প্রস্তুত থাকুন।”
মেলা বসলো জাতীয় মাঠে। সেখানে নানা স্টল।
এক স্টলে লেখা- 'টেন্ডার ব্যবস্থাপনা: কাজ না করেও বিল তোলার আধুনিক কৌশল।'
আরেক স্টলে- 'প্রশ্নফাঁস প্রযুক্তি: মেধাকে বিশ্রাম দিন।'
আরেকটিতে- 'লাইসেন্স এক্সপ্রেস: যোগ্যতা ছাড়াই অনুমতি।'
সবচেয়ে ভিড় ছিল একটি স্টলে।
নাম- 'গরিবের অধিকার পুনর্বণ্টন কেন্দ্র।'
সেখানে গরিবের জন্য বরাদ্দ চাল, কম্বল, ঘর, ওষুধ- সব স্বচ্ছল মানুষদের হাতে সুন্দর প্যাকেজে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।
মঞ্চে প্রধান অতিথি বললেন, করাপশন এখন আর সমস্যা নয়, সম্ভাবনা। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট, ভুয়া কাগজ বিশেষজ্ঞ সবাই আজ আত্মনির্ভরশীল।
জনতা হাততালি দিলো। যারা হাততালি দিলো না, তাদের নাম নীরবে নোট করা হলো।
মেলার শেষ দিনে আহসানকে বক্তৃতা দিতে বলা হলো। বিষয়- 'নতুন প্রজন্ম ও করাপশনের ভবিষ্যৎ'।
আহসান মঞ্চে উঠলো। সামনে মন্ত্রী, সচিব, ব্যবসায়ী, দালাল, কর্মকর্তা, সাংবাদিক- সবাই বসে। ক্যামেরা তাক করা।
আহসান মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আমি আজ করাপশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে চাই।
সবাই হাসিমুখে তাকালো।
আহসান বললো, করাপশন সত্যিই একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর কাঁচামাল হলো মানুষের অসহায়ত্ব। এর যন্ত্রপাতি হলো ক্ষমতা। এর শ্রমিক আমরা। এর পণ্য অন্যায়। আর এর ক্রেতা হলো- সেবাগ্রহীতারা।
হঠাৎ মাঠ নিস্তব্ধ। সে বলে চললো, এই শিল্পে লাভ অনেক। কিন্তু সমস্যা একটাই। এখানে রাষ্ট্র ধনী হয় না, মানুষ গরিব হয় আর মাঝখান থেকে গুটিকয়েক মানুষের গড়ে উঠে বিত্তের স্তূপ। ভবন উঁচু হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়। ফাইল এগোয়, দেশ পিছোয়। কিছু মানুষের পকেট ভরে, কবরস্থান ও শ্মশানে ভীড় বাড়ে।
আমরা সবাই মিলে এমন এক দেশ বানিয়েছি, যেখানে সৎ মানুষকে বোকা বলা হয়, আর চোরকে বুদ্ধিমান। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সমাজে চোরেরা সফলতার গল্প লেখে, সেখানে উত্তর প্রজন্ম অভিধানে ‘নৈতিকতা’ শব্দের অর্থ খুঁজে পাবে না।
তখনই কারো ইশারায় ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা নামিয়ে ফেললো। মন্ত্রী পানি খেলেন। আজহার সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।
হঠাৎই মাইকের সংযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো।
পরদিন পত্রিকায় খবর বের হলো-
"রাষ্ট্রীয় শিল্প মেলায় সামান্য কারিগরি ত্রুটি। অনুষ্ঠান সফল।"
আহসানের নাম কোথাও লেখা হলো না। তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হলো দূরবর্তী এক উপজেলায়।
এখন আহসান উর্ধতেনর নির্দেশ মতো চুপচাপ থেকে কাজ করে যায়। গোটা দেশ কখনো কখনো সরব হলেও চুপেচাপে আঁতাত করে চলে। অন্ধকারের বিশাল শিল্পাঞ্চলে তবু কোথাও কোথাও খুব ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি বাতি মৃদু আলো হয়ে জ্বলে থাকে কেনো যেনো।








