রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

ছোটগল্পেরা - ২

 



১. করাপশন লিমিটেড 


শহরের মাঝখানে এক বিশাল ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের নাম- 'জাতীয় করাপশন উন্নয়ন কর্পোরেশন'। সংক্ষেপে সবাই বলে, 'জাকউকো'। ভবনের নিচে বড় অক্ষরে লেখা-

"সততাই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু।"


প্রথম দিন চাকরিতে যোগ দিতে গিয়ে আহসান সাইনবোর্ড দেখে থমকে দাঁড়ালো। সে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা এক তরুণ। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে মানুষ হবে। মা বলতেন, সৎ থাকতে, তবেই নাকি শান্তি থাকতে জীবনে।

কিন্তু চাকরির বাজারে শান্তির কোনো বিজ্ঞাপন ছিল না। ছিল কেবল অভিজ্ঞতা, সুপারিশ, খাম, পরিচয়, নীরবতা, অন্যান্য আরও কিছু। 


আহসান রিসেপশনে গিয়ে বললো, আমি নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

রিসেপশনিস্ট মিষ্টি হেসে বললো, অভিনন্দন। কোন বিভাগে?

আহসান বললো, জনসেবা শাখা।

রিসেপশনিস্ট তরুণী মৃদু হেসে বললো, ওটা আমাদের সবচেয়ে লাভজনক বিভাগ। মানুষ যত বেশি সেবা চায়, আমরা তত বেশি আয় করি।

আহসান একটু অবাক হয়ে ধীরে ধীরে বললো, কিন্তু সেবা তো জনগণের অধিকার।

রিসেপশনিস্ট এবার গম্ভীর হয়ে বললো, দেখুন- এখানে অধিকার বলে কিছু নেই। এখানে সবকিছু প্যাকেজ। এই বলে একটি ব্রোশিওর এগিয়ে দিল। তাতে লেখা-


সেবা প্যাকেজসমূহ:

সাধারণ প্যাকেজ: ফাইল হারিয়ে যাবে।

সিলভার প্যাকেজ: ফাইল পাওয়া যাবে, কিন্তু সই হবে না।

গোল্ড প্যাকেজ: সই হবে, তবে তারিখ ভুল হবে।

প্লাটিনাম প্যাকেজ: সব ঠিক হবে, তবে স্রষ্টার আশীর্বাদ ও নগদ সহযোগিতা প্রযোজ্য।


আহসানের মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা! তবু সে নিজেকে বোঝালো, ভেতরে গিয়ে দেখি, হয়তো ভুল বুঝছি।

কিন্তু ভেতরে গিয়ে সে বুঝলো, ভুল সে করেনি; বরং দেশই অনেক আগেই ভুলকে নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে।


সেদিনই অরিয়েন্টেশন ক্লাস শুরু হলো। প্রশিক্ষকের নাম আজহার সাহেব। তিনি ত্রিশ বছর ধরে করাপশন শিল্পে কর্মরত। তার কণ্ঠে অভিজ্ঞতার ভার, চোখে সফলতার তেলতেলে দীপ্তি।

তিনি বললেন, তোমরা যারা নতুন এসেছো, মনে রেখো- ঘুষ নেওয়া কোনো অপরাধ নয়, যদি সেটাকে সুন্দর নামে ডাকা যায়। ঘুষ শব্দটা অশ্লীল। আমরা বলি- সম্মানী, সহযোগিতা, চা-নাস্তা, মিষ্টিমুখ, ফাইল-গতিশীলতা ফি।


একজন প্রশিক্ষণার্থী হাত তুলে অনুমতি নিয়ে জানতে চাইলো, কেউ যদি টাকা না দেয় স্যার?

আজহার সাহেব হেসে নিয়ে বললেন, তাহলে বুঝবে লোকটি অসামাজিক। তাকে সময় দিতে হবে। ফাইলকে একটু বিশ্রাম দিতে হবে। ফাইলকে যে পরিচালিত করে- সে তো মানুষ, তারও ক্লান্তি আছে। 

সবাই হেসে উঠলো। আহসান হাসতে পারলো না।


দুপুরে তাকে একটি টেবিল দেওয়া হলো। টেবিলের ওপর তিনটি সিল।

প্রথম সিলে লেখা- 'প্রক্রিয়াধীন'

দ্বিতীয় সিলে- 'অপূর্ণ কাগজপত্র'

তৃতীয় সিলে- 'উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তাধীন'

পাশের কর্মকর্তা কানে কানে বললেন, এই তিনটি সিল দিয়েই দেশ চলে।


বিকেলে এক বৃদ্ধ এলেন। পরনে মলিন পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো ফাইল। তিনি বললেন, আমার পেনশনের কাগজটা ছয় মাস ধরে আটকে আছে। একটু দেখবেন?

আহসান ফাইল খুললো। সব কাগজ ঠিক আছে। সে বলল, আপনার কাজ হয়ে যাবে।

বৃদ্ধের চোখে পানি এসে গেল। আবেগ সংবরণ করে বললেন, আপনার মঙ্গল হোক।


আহসান ফাইলে সই করতে যাবে, এমন সময় পাশের কর্মকর্তা তার হাত চেপে ধরে বললেন, এভাবে নয়। আগে ফাইলের মন বুঝতে হয়।

আহসান আবাক হয়ে বললো, ফাইলের মন?

সহকর্মী কর্মকর্তা বললেন, হ্যাঁ। ফাইলের মন খুব সংবেদনশীল। একটু তেল না দিলে চলে না।


বৃদ্ধ সব বুঝলেন। পকেট থেকে কাঁপা হাতে এক হাজার টাকার দুইটি নোট বের করে বললেন, আমার কাছে এতটুকুই আছে।

আহসানের বুক ধক্ করে উঠলো। সে নোট দুটোর দিকে একপলক তাকিয়ে বললো, কোন টাকা লাগবে না।


অফিস হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল! যেন কেউ জাতীয় সংগীতের মাঝখানে হাঁচি দিয়েছে।

আজহার সাহেব দূর থেকে ডেকে বললেন, আমার রুমে আসো তো আহসান।


আহসান রুমে ঢুকতেই আজহার সাহেব দরজা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, তুমি কী করেছো জানো?

আহসান বললো, আমি একজন বৃদ্ধের কাজ করেছি, স্যার।

আজহার সাহেব বললেন, না। তুমি সিস্টেমের অপমান করেছ।

আহসান বললো, সিস্টেম যদি অন্যায় হয়?

আজহার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি এখনো তরুণ। ভাবছো- সততা দিয়ে দেশ পাল্টাবে। এই দেশে সততা হলো এমন এক রোগ, যার চিকিৎসা সমাজ নিজেই করে নেয়। কেউ বেশিদিন আক্রান্ত থাকে না।

আহসান চুপ করে রইলো।


পরদিন অফিসে এসে সে দেখলো তার টেবিল বদলে গেছে। তাকে পাঠানো হয়েছে 'নৈতিকতা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনী শাখা'- তে।


এই শাখা ছিল ভবনের পেছনে, জানালাবিহীন ছোট ঘরে। ঘরের মাঝখানে কাচের বাক্সে রাখা একটি পুরোনো বস্তু। নিচে লেখা-

'সততা: বিলুপ্তপ্রায় প্রশাসনিক উপাদান।'


মাঝেমধ্যে নাকি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে আসে। সেদিন গাইড শিক্ষার্থীদের দেখিয়ে বলে, একসময় এই দেশে সততা পাওয়া যেত। মানুষ টাকা ছাড়াও কাজ করত। এখন এটি জাদুঘরে সংরক্ষিত।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জিজ্ঞেস করলো, সততা কি খাওয়া যায় আঙ্কেল?

গাইড বললো, না। তাই তো টেকেনি।


আহসান কাচের বাক্সের পাশে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে মনে হতো, বাক্সের ভেতরে বস্তুটি নড়ছে। যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। যেন এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি।


একদিন দুপুরে জরুরি ঘোষণা এলো।

"রাষ্ট্রীয় করাপশন শিল্প মেলা শুরু হতে যাচ্ছে। সকল বিভাগ প্রস্তুত থাকুন।”


মেলা বসলো জাতীয় মাঠে। সেখানে নানা স্টল। 

এক স্টলে লেখা- 'টেন্ডার ব্যবস্থাপনা: কাজ না করেও বিল তোলার আধুনিক কৌশল।'

আরেক স্টলে- 'প্রশ্নফাঁস প্রযুক্তি: মেধাকে বিশ্রাম দিন।'

আরেকটিতে- 'লাইসেন্স এক্সপ্রেস: যোগ্যতা ছাড়াই অনুমতি।'


সবচেয়ে ভিড় ছিল একটি স্টলে। 

নাম- 'গরিবের অধিকার পুনর্বণ্টন কেন্দ্র।'

সেখানে গরিবের জন্য বরাদ্দ চাল, কম্বল, ঘর, ওষুধ- সব স্বচ্ছল মানুষদের হাতে সুন্দর প্যাকেজে তুলে দেওয়া হচ্ছিল।


মঞ্চে প্রধান অতিথি বললেন, করাপশন এখন আর সমস্যা নয়, সম্ভাবনা। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। দালাল, মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট, ভুয়া কাগজ বিশেষজ্ঞ সবাই আজ আত্মনির্ভরশীল।

জনতা হাততালি দিলো। যারা হাততালি দিলো না, তাদের নাম নীরবে নোট করা হলো।


মেলার শেষ দিনে আহসানকে বক্তৃতা দিতে বলা হলো। বিষয়- 'নতুন প্রজন্ম ও করাপশনের ভবিষ্যৎ'।


আহসান মঞ্চে উঠলো। সামনে মন্ত্রী, সচিব, ব্যবসায়ী, দালাল, কর্মকর্তা, সাংবাদিক- সবাই বসে। ক্যামেরা তাক করা।

আহসান মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, আমি আজ করাপশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলতে চাই।

সবাই হাসিমুখে তাকালো।

আহসান বললো, করাপশন সত্যিই একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। এর কাঁচামাল হলো মানুষের অসহায়ত্ব। এর যন্ত্রপাতি হলো ক্ষমতা। এর শ্রমিক আমরা। এর পণ্য অন্যায়। আর এর ক্রেতা হলো- সেবাগ্রহীতারা।


হঠাৎ মাঠ নিস্তব্ধ। সে বলে চললো, এই শিল্পে লাভ অনেক। কিন্তু সমস্যা একটাই। এখানে রাষ্ট্র ধনী হয় না, মানুষ গরিব হয় আর মাঝখান থেকে গুটিকয়েক মানুষের গড়ে উঠে বিত্তের স্তূপ। ভবন উঁচু হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা হয়। ফাইল এগোয়, দেশ পিছোয়। কিছু মানুষের পকেট ভরে, কবরস্থান ও শ্মশানে ভীড় বাড়ে।

আমরা সবাই মিলে এমন এক দেশ বানিয়েছি, যেখানে সৎ মানুষকে বোকা বলা হয়, আর চোরকে বুদ্ধিমান। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সমাজে চোরেরা সফলতার গল্প লেখে, সেখানে উত্তর প্রজন্ম  অভিধানে ‘নৈতিকতা’ শব্দের অর্থ খুঁজে পাবে না।


তখনই কারো ইশারায় ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা নামিয়ে ফেললো। মন্ত্রী পানি খেলেন। আজহার সাহেব চোখ বন্ধ করলেন।

হঠাৎই মাইকের সংযোগ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো।


পরদিন পত্রিকায় খবর বের হলো-

"রাষ্ট্রীয় শিল্প মেলায় সামান্য কারিগরি ত্রুটি। অনুষ্ঠান সফল।"


আহসানের নাম কোথাও লেখা হলো না। তাকে তাৎক্ষণিক বদলি করা হলো দূরবর্তী এক উপজেলায়।

এখন আহসান উর্ধতেনর নির্দেশ মতো চুপচাপ থেকে কাজ করে যায়। গোটা দেশ কখনো কখনো সরব হলেও চুপেচাপে আঁতাত করে চলে। অন্ধকারের বিশাল শিল্পাঞ্চলে তবু কোথাও কোথাও খুব ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি বাতি মৃদু আলো হয়ে জ্বলে থাকে কেনো যেনো।


সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

ভ্রমণ : স্কটল্যান্ড

 ১.

ক্যালটন_হিল_ন্যাশনাল_মনুমেন্ট (National Monument of Scotland)


ক্যালটন_হিল_ন্যাশনাল_মনুমেন্ট (National Monument of Scotland) স্কটল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ঐতিহাসিক স্থাপনা। এটি এডিনবার্গে ক্যালটন হিলের শীর্ষে অবস্থিত এবং এর আর্কিটেকচারের জন্য একে প্রায়শই "স্কটল্যান্ডের পার্থেনন" বলা হয়। মনুমেন্টটি স্কটল্যান্ডের সামরিক ও নৌবাহিনীর সদস্যদের স্মরণে নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যারা নেপোলিয়নিক যুদ্ধে (১৮০৩ - ১৮১৫) মারা গিয়েছিলেন।


মনুমেন্টের মূল বৈশিষ্ট্য :

১. ডিজাইন ও স্থাপত্য:

ন্যাশনাল মনুমেন্টটি গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে ডিজাইন করা হয়েছিল এবং এটিকে অ্যাথেন্সের বিখ্যাত পার্থেননের আদলে তৈরি করার লক্ষ্য ছিল।

স্থপতি ছিলেন চার্লস রবার্ট ককারেল এবং উইলিয়াম হেনরি প্লেফেয়ার, যারা ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যে পারদর্শী ছিলেন।

২. নির্মাণকাল:

নির্মাণ শুরু হয় 1826 সালে। কিন্তু 1829 সালে এটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়, কারণ তখন অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

অর্থের অভাবে শুধুমাত্র ১২টি ডোরিক স্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছিল, যা এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

৩. নামকরণ ও উদ্দেশ্য:

এটি "ন্যাশনাল মনুমেন্ট" নামে পরিচিত কারণ এটি স্কটল্যান্ডের জাতীয় গৌরব ও ইতিহাসকে স্মরণ করে।

মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা, যেখানে প্রার্থনার স্থান, শিক্ষার কেন্দ্র এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনের প্রদর্শনী হবে।

৪. সমসাময়িক প্রতিক্রিয়া:

অসম্পূর্ণ রয়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই একে "স্কটল্যান্ডের লজ্জা" (Scotland’s Disgrace) বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে এটি এডিনবার্গ শহরের আইকনিক স্থান হিসেবে পরিচিত এবং এর অসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও এটি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।


কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ :

১. ঐতিহাসিক স্মরণ: ন্যাশনাল মনুমেন্ট সেইসব স্কটিশ সৈনিক ও নাবিকদের স্মরণ করায়, যারা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

২. পর্যটন আকর্ষণ: এটি একটি দর্শনীয় স্থান এবং এখান থেকে ক্যালটন হিলের অন্যান্য মনুমেন্ট এবং এডিনবার্গ শহরের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়।

৩. সাংস্কৃতিক প্রতীক: এটি স্কটল্যান্ডের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং গ্রীক স্থাপত্যের প্রতি আগ্রহের সাক্ষ্য বহন করে।


বর্তমান পরিস্থিতি :

আজ এটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। অনেক ভ্রমণার্থী এবং স্থানীয় মানুষ এখানে আসে ফটোগ্রাফি করার জন্য, বিশেষ করে সূর্যাস্ত এবং সূর্যোদয়ের সময়। এছাড়াও এটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ইভেন্টের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ন্যাশনাল মনুমেন্টের অসম্পূর্ণতাই সম্ভবত এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, যা এটিকে এক অনন্য পরিচিতি দিয়েছে।


মঙ্গলবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৪

দ্রোহের কবিতা - ২

 



১.

বাংলাদেশ ২.০


আমার জন্মের আগেই মা'কে ক্রুশ বিদ্ধ করে রেখেছিল সেনাশাসক। আর আমার শৈশবেই মায়ের মৃত্যু দেখেছি। এরপর খোলা কফিনে মৃত মা'কে নিয়ে কেবল প্রহসনই হলো পনেরো আনা। অনেক আতর-ধুপ, ঝাড়ফুক আর কিছু বিজ্ঞানের প্রলেপে জারিজুরি কিছু চেপে থাকলেও এখন কীটেরা বেরুচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে। আর কীট গিলবে এমন পতঙ্গও বিলুপ্ত প্রায়।

এখন সেই মৃত পঁচাগলা আমার মা স্বাধীনতার নতুন তকমা পেয়েছে, পেয়েছে অজস্র নতুন মেধাবী সন্তান আর এক মহাজন কান্ডারী। 



২.

স্বাধীনতা

ধনতন্ত্রের রুপ বোঝা খুব কষ্টকর না।

সহস্র ঋণের জালে আঁটকে 

দঁড়ি বা শেকলের বাঁধনের পরিবর্তে

সোনায় মোড়ানো হ্যান্ডকাফ থাকে, যেনতেন কাপড়ে

মুখ মোড়ানোর পরিবর্তে রত্ন খচিত মখমল বড়জোর।

রঙিন চশমায় যেমনই দেখা যাক, ধূসর ধূসরই থাকে

কার্পেটে ক্ষত লুকানো মেঝের মতন।

ধনতন্ত্রে স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। 





বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০২৩

কথোপকথন - ৪

 


১.

কথোপকথনঃ মধু পুরাতন, পাত্র


- তোমার হাতটা দেখি।

- উদ্দেশ্যটা কি? সত্যিই কি জ্যোতিষশাস্ত্র কিছু

  জানা আছে নাকি হাত ধরার বাহানা?


- সত্যিটা বলবো? কিছু মনে না করলে

  বলতে পারি।

- মিথ্যে না বললেই হলো।


- ইচ্ছে করে তোমার হাতদুটো ধরতে।

  সুযোগ আর সাহসের এতো অভাবে

  আর ধরা হয়নি!

- তাই বুঝি?


- অন্য প্রয়োজনে এটা-ওটা বিনিময়ে

  নিজেদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে তোয়াক্কা না করে

  যেদিন আঙ্গুলেরা আলতো ছুঁয়ে নেয় পরস্পর

  সেতারের তারে যেন টোকা দিয়ে যায়

  তারও তিন-চার দিন বয়ে চলি সেই ঘোর।

- আজকাল এই চলছে?


- তবে কি ব্রেক কসবো?

- পাবলিক, জেব্রা ক্রসিং, স্পীড ব্রেকার

  দেখে চলা ভালো।


- কাগজপত্র নেই, মামলা খাবার ভয় তো থাকেই।

- ট্রাফিক সার্জেন্ট সদয় হলে ছাড় পেতেও পারেন। 


- যাইহোক, তোমার হাতের রেখা বলছে

   চন্দ্র, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র তোমার চারপাশে ঘিরে। তাই

   সুখে, জ্ঞানে, ধনে, প্রেমে তোমার জীবন পরিপূর্ণ। 

- হয়েছে-হয়েছে। কাছাকাছি এমন কথা বেশ ক'জনই

   বলেছে তাও হাত না ধরেই।


- হতে পারে মধু পুরাতন, পাত্রটা তো নতুন।

- আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আশেপাশের লোক

   ভীড় করবে। এবার তো হাতটা ছাড়ুন? 




  

২.

কথোপকথনঃ সেল


- দারুণ একটা খবর আছে।

- তবে যে শুনতেই হয়।


- ব্ল্যাক ফ্রাইডে সেলে তুলে ধরেছি হৃদয়।

  নেবেন? জিততে না পারলেও

  হারবেন যে না সেটা নিশ্চিত। 

- শুনেছি পুরাতন, আটকে থাকা কিংবা

  অচল জিনিসের নাকি সেল চলে।

  মলে ক্লিয়ারেন্স সাইড দেখলেই

  তার কিছু আভাস পাওয়া যায়। 


- শোনা কথায় কান দেবেন না তো!

  পরখ করে দেখুন না?

- তা পরখের ধরণটা বলুন দেখি?


- কার কেমন করে পরখ করতে

  ভালো লাগে তা কিভাবে বলি!

- জিনিস আপনার তাই আপনিই তো

  ভালো ধারণা দিতে পারেন। তাই না?


- বেচা বিক্রিও যে কি কঠিন ব্যাপার

  সে আপনার মত ক্রেতার সম্মুখীন হলে

  তবেই বোঝা যায়!

- ভালো জিনিস কি আর

  ক্রেতার চোখ এড়ায়।


- যাহ্ বাবা! এমন আগুনে খবরে

  এভাবে পানি ঢেলে দিলেন?

- দিলাম। এরপর

  আরও ভালো করে প্রস্তুতি নিয়ে আসবেন।




৩.

কথোপকথনঃ অভ্যেস


- সিগারেট একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? 

- হুম।


- ফুসফুস পোড়াতে ভালো লাগে?  

- একবার তো জানতে চাও না

  কেনো পোড়াই ভেতর?


- আহা! মারাত্মক ভুল হয়ে  গেছে।

  আচ্ছা, কেন?

- মন পোড়ে বলে।


- মন কেনো পোড়ে?

- বিশেষ একজন বোঝেনি বলে।


- সেই বিশেষ একজন বুঝলে মন সারবে?

- সারবে কি? মহাআনন্দে উড়বে!


- তবে মন সারলে সিগারেট বাদ?

- অভ্যেস বদলাতে সময় লাগে না!




৪.

কথোপকথনঃ সমস্যার সমাধান 


- আপনার সমস্যা কি? কখন আসার কথা

  আর কখন আসলেন?

- আগেই বলে রাখছি, আজ একটু

  অন্যমনষ্ক থাকতে পারি। এই ধরুন-

  একটু অসংলগ্ন কথা, কখনো

  অতি উত্তেজনা, হুটহাট দরকারি কাজ

  বা কিছু মিস করা বা ফেলে দেয়া, ইত্যাদি। 


- কেন?

- আজ আপনাকে নিয়ে অদ্ভুত এক

  স্বপ্ন দেখেছি। সেই ঘোর এখনো ছাড়েনি!


- সত্যি করে বলেন তো, এর আগে

  ক'জন কে এমন করে বলেছেন?

- আপনার সামনে গেলেই এক বোকা ভূত

  মাথায় এসে বসে!

  ক্লাস টু'র শিক্ষার্থী মনে হয় নিজেকে

  জ্ঞানী শিক্ষকের সামনে

  যা বলবো তাই বুঝি ভুল হয়ে যাবে! 


- প্রতিদিন আমাকে ক'টা রাউন্ড এবাউট

  পার করতে হয় জানেন?

  সেই আমাকে ইউ ট্রার্ন চেনান! থাক।

  বললেন নাতো, এবার এটা তো বলেন,

  আপনাকে কি বলে সেই মাপের একটা

  ঝাড়ি দেয়া যায়?

- আশ্চর্য! আবহাওয়ার পূর্বাভাস তো

  অন্যরকম ছিল। আমি নিশ্চিত যে কোথাও

  আপনার সমস্যা হচ্ছে। 


- জী, আমার সমস্যা হচ্ছে।

  কিছু অর্ডার করা আছে, খেয়ে বিল মিটিয়ে

  আপনার ঘোরের মাঝেই থাকেন।

  আমি আমার সমস্যার সমাধানে যাচ্ছি।

- আরে... আরেহ্... হচ্ছেটা কি...?




৫.

কথোপকথনঃ ভালোবাসি 


- একবার বলো না 'ভালোবাসি'! 

- তুমি আগে বলো?


- ভালোবাসি, ভালোবাসি। 

- আচ্ছা। 


- কি হলো?

- জানলাম। 


- ভালোবাসি। 

- হুম।


- ভালোবাসি। 

- ঘৃনা করি।


- পারলে এমনটা বলতে?

- ওটাই ভাবলে!

  আমার যে শুনতেই ইচ্ছে করছিল।



৬.

কথোপকথনঃ একদিন সাবেকের সাথে 


- কেমন আছো?

- ভালো-খারাপের হিসেব করতে

  ইচ্ছে করে না।


- প্রেম, বিয়ে কিছু কি করবে না?

- চারপাশে দেখলাম কতো!

  সবাই তো মোহ মেটাতে আসে তারপর

  জীবনের নিরাপত্তার হিসেব মিলিয়ে নিয়ে

  প্রেমের দার্শনিক বুলি আওড়িয়ে

  নির্দ্বিধায় কেটে পরে। তাই ...। 


- আমি তো স্বেচ্ছায় হারিয়েছি তোমার

  জীবন থেকে, তবু এখনও কেন ...? 

- হারিয়ে আর কতটুকু হারালে

  আদৌ পুরোপুরি হারায় কি কিছু?

  হারিয়েও কতকিছু আরো সজীব হয়ে

  বেঁচে থাকে স্মৃতিতে!


- শেষমেশ যাইহোক, আমাদের

  ভালো থাকার কথা ছিল।

- একসময় কথা তো এও ছিল

  জলের মতো মিশে থাকবো দুজন।


- দোষ কি আমার একার ছিল?

  তোমার খেয়ালিপনা, দাঁড়াবার স্থানহীনতা

  সেসবও কি নিয়ামক ছিল না?

- শত হাহাকারহীন অভাব নিয়েও

  ভালোবাসে যে প্রাণ

  তার ক্ষতে নুন নাই ছেটালে।

  এটুকু সংযম থাকবে মানুষের

  এমন প্রত্যাশাটুকুও আষাঢ়ে গল্প হবে কি?


- দার্শনিক কথা তুমিও কম বলো না।

  যাইহোক, আমার ঘুরেফিরে মনে আসে

  হেলাল হাফিজ, '... বিরহে উজ্জ্বল'। 

- অস্বীকার করি কিভাবে। 


- পরস্পরের বিভক্তির এই বিচ্ছিন্নতা

  হয়তো ভালোই হয়েছে, বলো?

- কি জানি। তবুও হয়তো একদিন 

  বেদখল হয়ে যাবে পরস্পরের হৃদয়।



৭.

কথোপকথনঃ

বাস্তব যেখানে শূন্য, ভাবনায় যেটুকু মেলে


- এইযে প্রেমিক, কেমন কাটছে দিনকাল? 

- দূরে গিয়ে বিরহ উদযাপন ছাড়া আর

  কিছু কি রেখে গেছ আমার জন্যে?


- বেশ হয়েছে। তা এখন তোমার

  নখদন্ত নিশপিশ করে না? 

- না। এখন মাঝেমধ্যে উল্টো জ্বালায় ভুগি।


- সে কেমন?

- ইদানীং আমাদের পেড়িয়ে আসা মূহুর্তেরা

  মনে এসে আমাকে থমকে দেয়

  আর অমনি স্মৃতির দরজা খুলে

  ঢুকে পড়ো তুমি অনুমতি ব্যতিরেকে!


- কি আশ্চর্য! তারপর? 

- এমনি অবয়বে তুমি কেমন বেপরোয়া যেন

  হুটহাট টানাটানি শুরু করে দাও

  যখন-তখন, এটা-ওটা, এখানে-সেখানে

  যখন যা ইচ্ছে হয়! 


- ভাবনার ভেতরেও এত বাড়াবাড়ি!

  কবে এমন করেছি শুনি?

- আমাদের বাস্তবতার হিসেব এখানে

  বিবেচ্য নয় প্রিয়।


- বুঝলাম। তারপর?

- তারপর ভুল ভেবে আচমকা আঁতকে উঠি! 

  ক্ষানিকটা কর্পূরে আক্ষেপ হলেও

  মন বলে এও বেশ।


- সত্যিই মন বলে এও বেশ?

- বাস্তব যেখানে শূন্য, ভাবনায় যেটুকু মেলে

   তাই কি অসামান্য না?



৮.

কথোপকথনঃ গোয়েন্দা 


- আবারও! আপনাকে না করেছি আমার

  সাথে যোগাযোগের চেষ্টা না করতে?

- আমার যে এছাড়া আর কিছুই

  ভাল্ লাগে না। 


- ভাল্ লাগবে কি করে, কাজকর্ম নাই। 

  আপনার তো বৃষ্টি জলে স্নান আর

  রৌদ্র তাপে গা শুকান! আহা!

- মানে কি?


- মানে, বাপের হোটেল-মায়ের হেঁশেল। 

- খোঁটা দিলেন?


- সে কি! আপনি কত ভগ্যবান।

  এমন জীবন ক'জন পায় বলুন?

- কি সুরেলা শক্ত কথা!

  দুদাঁতের মাঝে নুড়ি পরলো যেন।

  প্রহসনে প্রশংসা হচ্ছে বুঝি?


- উকিল হলে ভালো করতেন।

- যা করছি সেটা বুঝি কম ভালো? 


- কি এমন করছেন?

- আপনিও বুঝি আমার কাজকে অযথা

  মনে করেন?


- শুধু ভালোবাসায় জীবন বাঁচে না মশাই।

  আচ্ছা, ড্রাইভ করতে পারেন? 

- আমি অটোরিকশাও চালাতে পারি না।


- তাতে কি! ঠিকই তো মেয়েদের নিয়ে

  অটোরিকশায় ঘুরতে পারেন।

- আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। 


- হয়তো। তা গতকাল সাথে থাকা 

  ঐ মেয়ের সাথে আপনার সম্পর্ক কি?

- যেমন আপেলের সাথে মধ্যাকর্ষণের।


- লজ্জা করছে না বলতে?

- সচলতার জন্যে কিছু অচল জিনিসের

  প্রয়োজন হয়ই। আর একপলক দেখেই

  সবটুকু সত্যি জানা যায় না। জানেন তো,

  যমজেরও থাকে বাধ্যতামূলক বৈপরীত্য। 


- এই, রাখুন তো!

  আপনার কথার প্রেমে পড়তে চাই না।

- তবে?


- পালাবো। আপনার থেকে পালাবো।

- তবে আমি জীবনের লক্ষ্য পেয়ে গেছি।


- অবশেষে পেলেন?

- আপনি দ্রুত পালান। কিসের কি!

  আমি গোয়েন্দাই হবো।




লেবেলসমূহ:

বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

কথোপকথন - ৩



 


 ১.

কথোপকথনঃ প্রায় প্রেম


- আর কিছুদিন গেলে

   তোমার প্রেমে পড়েই যেতাম বোধহয়। 

- পড়েননি বুঝি?


- যতটুকু পড়েছিলাম তাতে

  ডুবে হাবুডুবু খাওয়ার সুযোগ ছিল না। 

- অনুমতি না নিয়ে পড়েছিলেন যে!


- বাহ্ রে! প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিষেধ ছিল কি?

- জ্ঞাত না করা নৈতিকতা বিরুদ্ধ কি-না।

   যাইহোক, আর কেউ কি জানতো?


- চিপসের প্যাকেটের মতো ফুলিয়ে প্রেম

   সবাই কি দেখাতে পারে?

- উঁরি বা-বা!



২.

কথোপকথনঃ ধাক্কা 


- তোমাকে যদি মেরে ফেলতে চাই

  পারবে নিজেকে বাঁচাতে?

- আমি তো আজকাল মশাদের সাথেই

  পারি না, ফের তোমার সাথে ...! 


- তবে মেনে নেবে আমার হাতে মৃত্যু? 

- তোমার হাতে মরে যেতে আপত্তি নেই।

  যদি সে খুন ঠান্ডা মাথায় হয়, তবেই দুঃখ।

  মৃত্যুর পরেও অস্বস্তি ।


- তোমার আত্মা স্বর্গবাসী না হয়ে

  ঘুরবে বুঝি আমার চারপাশে? 

- ভাবছি। 


- কি ভাবছো?

- কত কত সুন্দরীই তো অস্বাভাবিক মরলো।

  তাদের সাথে দেখা হয়ে যায় যদি?


- দেখা তো হতেই পারে।

- তুমিও বলছো?


- হুম।

- তাহলে অযথা তোমার চারপাশে না ঘুরে

  তাদের সাথেই না হয় ... 


- কি?

- ওই আর কি।


- কি সেটা?

- এই ধরো ইটিস-পিটিস। 


- আহা! কি খুশির বিষয়। তাহলে

  আমি আর পুলিশি ঝামেলায় না জড়াই।

  আগাম শুভকামনা। এখনি একটা কড়া

  কীটনাশকের বোতল এনে খেয়ে ফেল।

- বাহ্ রে!

  আজাইরা মরামরির কাহিনি শুরু করলে তুমি

  আর নিজেকেই মারবো আমি?


- তোমার নিভৃত কামনার জন্যই সোনা।

  সুন্দরীদের প্রতি কি ভীষণ লোভ তোমার!

- উঠছো যে?


- আগ্রহ শেষ। তোমাকে জানা হয়ে গেছে।

  বিদায়। 

- বাহ্ রে! আমাকে দিয়ে গর্ত খুড়িয়ে 

  আমাকেই ধাক্কা? এই-এই, দাঁড়াও...! 



৩.

 কথোপকথনঃ লাইটার


- এই যে, কি খবর?

- পর সংবাদ এইযে, ফুসফুসের ১১ টা প্রায় বেজে গেছে।


- ১৪ টা বাজলে জানিও।

   অনলাইনে একটা সাদা শাড়ি অর্ডার করবো।

- ত্যাড়ামো আরো বেশি করো, যতটা করলে

   মেজাজটা সেই পরিমাণ বিগড়ে যায়। কেমন?


- ওমা... কি সেক্সি কথা!

   ওই গু' খেয়ে ভাব ধরবে আর দোষ হবে আমার?

- আমার খাওয়া-খাউয়ির রুচি নষ্ট হতে বসেছে।

   ভাবছি এখন থেকে তোমার চুলের গন্ধ মাখা বাতাস

   সজোরে নেব শুধু ফুসফুসে।


- হয়েছে, হয়েছে।

  তুমি যে সেই একই জিনিস জানা আছে। 

- মাঝেমাঝে ভাবি, তোমার মত আর কে বুঝবে আমাকে!

   আচ্ছা, তোমার পার্সে লাইটারটা এখনো আছে?



৪.

কথোপকথনঃ ছিপি আঁটা বোতল


- ইদানীং নষ্ট হতে ইচ্ছে করে।

- সত্যিই করে?


- খুবই। 

- হচ্ছোনা কেন?


- উদ্যোগী হই কখনো কখনো, তবু

 যেই মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠো তুমি

 অমনি সিন্দাবাদের জাহাজের খালাসীকে

 কিছু নজরানা দিয়ে নষ্ট ইচ্ছেদের

 ছিপি আঁটা বেতলে ভরে

 দিয়ে দিই মাঝ সমুদ্রে ফেলে দিতে। 

- তবে আর ইচ্ছে হয় কেন?


- হবে না বুঝি?

 তোমার পকেট ভর্তি সময়ের খুচরো

 কয়েন আর নোট, অথচ আমি চাইলেই ...! 

- পাও না বুঝি?


- জোটে তো কেবল শিকি-আধুলি,

 নোটগুলো কারা পায় কে জানে।

- এতো লোভ কেন শুনি?


- বাহ্ রে! শুভঙ্করের ডাকাত হতে ইচ্ছে হলে

  আমার বুঝি ভিক্ষুক হতেও মানা?



৫.

কথোপকথনঃ গোলযোগ


- ভালোবাসো?

- তুমুল!


- হুহ!

- এমন হলে তো আমার কিছু কথা শুনতে।

- বাহ্ রে!

  খায়েশের লম্বা চুলে কাঁচি চালালে।

  আয়েশের মাঝ সিঁথি পাল্টে একপাশে

  এসেছি। বিষকাঠি ছাড়ি ছাড়ি বলে।

  সিঙ্গেল মেয়েদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক

  ছেড়েছি। পাইপ লাইনে আরো কত্ত কিছু!

  তারপরও এমন টা বললে?


- কতোটা ছেড়েছ শুনি?

  তুমি ৬ ফুটের ছেলে, যে লম্বা চুলে মানাবে

  আর মাঝখানে সিঁথি কাটলে

  কি বিরক্তিকর লাগে বোঝো?

  যেটা ছাড়ি ছাড়ি করছো সেটা পুরোপুরি

  ছাড়ার বর্ষপূর্তিতে আমাকে জানিও

  সাড়ম্বরে উদযাপন করবো। আর

  'স্বাভাবিক সম্পর্ক' কি জিনিস?

  তোমার ক'জন বন্ধুই তো নাকি

  একসাথে ৪/৫টা প্রেম করে।

  তোমার ক্ষেত্রেই বা রিক্স নেব কেন?

- বাপরে বাপ! তুমি একটা ... 


- কি? যা-তা? বেশ, আপাতত তোমার সাথে

  কোন কথা নেই। 

- এটাই হয়, গোলোযোগ মাঝ সমুদ্রে

  আর আমার চালে ঝড়!



৬.

কথোপকথনঃ ঘুম


- শোনো, ঘুম পেয়েছে।

- আমার সাথে কথা বলতে এলেই 

  বুঝি তোমার চোখে ভর করে রাজ্যের ঘুম?


- কি করবো বলো? 

   তোমার কথাগুলোই যে এমন

   যেন সোনার কাঠি-রুপোর কাঠির শিল্পীত বিন্যাস!

   জেগেই তো থাকি জাগতিকতায় সারাটাদিন 

   ক্লান্তি আর বিরক্তির বিষাদে খিটিমিটি মনে

   কামনা করি তোমারই ফোন কল। 

- তারপর?


- তোমার কথারা যেন রুপকথার উড়ন্ত চাদর

   আমায় নিয়ে ভেসে চলে হাওয়ায় আর

   খসে পড়তে থাকে ক্লান্তি ও বিষাদেরা

   মেঘেরা পাফ করে চলে সুখ আর

   বুজে আসে চোখ আমার নিবিড় প্রশান্তিতে।

.

.

.

- বেশ বিভ্রান্তিকর সমীকরণ আমার জন্যে।

   যাইহোক, তারপর?

   হ্যালো। হ্যালো...!

   ঘুমাও তবে।

   আমার কাছে সব দেয়ালই ভালোবাসা পরিবাহী।



৭.

কথোপকথনঃ

ফোনের এপাড়-ওপাড়ে প্রেম


- প্রিয় দূরদ্বীপ বাসিনী, কেমন আছো?

- তোমাকে ছাড়া বড় অসহ্য বেঁচে থাকা

   কানকোয় কাতরিয়ে ডাঙা পেরুনো কইয়ের মতোন

   যেন একা একা বাতাসে ভেসে বেড়ানো অতৃপ্ত আত্মা

   কোণা ছেঁড়া ক্রমাগত পাঁক খাওয়া ঘুড়ির মতো

   ভাবনারা পাঁক খায় কেবল ক্যালেন্ডার জুড়ে!

   তুমি কবে আসবে?

   আমাকে ছাড়া কিভাবে থাকো তুমি?

   কেমন আছো আমিহীন?


- একলা শালিকের বিষন্নতায় কাটে রাত্রিদিন।

   কিভাবে যে থাকি, যদি দেখতে!

   মাঝে মাঝে ভাবি

   হতো যদি তারাগুলো

   এক বাল্ক এস.এম.এস. তোমার,

   চাঁদটা জুম ইনে তোমার মুখ,

   আকাশ হতো থ্রিডি স্ক্রিন যেখানে

   আমার জন্যই লাইভ টেলিকাস্ট হবে

   তোমার ইন আর আউট ডোরের গোটা দিন!

- পাগল!

   জানো, চোখ বুজলে আমার চোখ জুড়ে একঝাঁক

   প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়! চোখ মেললে, ছয়দিক জুড়ে

   নস্টালজিক রুক্ষ পরিবেশ স্মিত হাসে!

   কেমন করুন সুর বয় হাওয়ায় আর চতুর কোকিলটাও

   ঝিমোয় পেঁচার মত!


- আমারও কি যে হয়!

   প্রচন্ড শীতের মত নিরবতা নেমে আসে।

   এতযে স্যাটেলাইট মাথার উপর, চারপাশে কত রাডার

   আর শুভাকাঙ্ক্ষীর দল, জানাতে পারে না কিছুই!

   কবে যে থাকবে জামার মতোন জড়িয়ে শরীর?

- রসুন বোনা শেষ, আসছে মাড়াইয়ের দিন।

   মৃত্যুর নামক অমোঘ সত্যিটা তোমার বুকেই হোক।



৮.

কথোপকথনঃ প্রস্তাব 


- এইযে শুনুন? একটু কথা বলতে পারি?

- ভদ্রতা বজায় রাখতে পারলে বলুন।


- এই যা!

  হিসেব-নিকেশের মাঝে ফেলে দিলেন।

- কেমন হিসেব-নিকেশ?


- অলরেডি হিসেব-নিকেশ শুরু হয়ে গেছে।

  বলছি একটু পর।

  এই ফাঁকে আপনার নামটা জানতে পারি?

- এরপর কি মুঠোফোন নাম্বার চাইবেন?


- ওরে বাবা! আপনি তো হিসেব-নিকেশের

  সময় আরও বাড়িয়ে দিলেন।

- আমি আর কি করলাম, বাড়াচ্ছেন তো আপনি।


- মাপ করবেন। আপনার সম্পর্কে আমার

  আর কিছু জানতে চাওয়ার নেই। 

- আশ্চর্য! আপনি এত ভালো মানুষের ভান

  ধরছেন কেন? আমার পুরো বায়োডাটা 

  জানবেন না?


- জনাব, দরকার নেই। কথাটা শুরু

  করার জন্যে আমিই না হয় আপনার

  একটা নতুন নাম দিই?

- তারপর আকিকার জন্যে ডিনারের ইনভাইট করবেন? 


- দেখেও বোঝেন না! পকেটে এত তেল নেই।

   সো এতটা বিরক্ত হবেন না প্লিজ। 

- আচ্ছা। কি নাম শুনি?


- রুপা।

- হুমায়ুন আহমেদ এর উপন্যাসের চরিত্র?


- হুমায়ুন আহমেদ পড়তে পছন্দ করেন?

- খুব।


- তাহলে নামটির অনুমোদন দিচ্ছেন? 

- রুপা চরিত্রটি আমার পছন্দের।

  তাই অনুমোদন দিলাম।


- ধন্যবাদ। 

- আমার একটু তাড়া আছে।

  আপনার মূল কথাটি বলুন।


- রুপা, হাত বাড়াবেন? শুভ্র হবো।



৯.

কথোপকথনঃ শ্রাবণ


- আমার একহাতে দহন আরেক হাতে শ্রাবণ

   কোন্'টা নেবে?

- দহন তবে।


- শ্রাবণ কেন না?

  শ্রাবণ ধারায় পেখম মেলে

  নাচতে পারতো তোমার মন ময়ূরী।

- ওদিকে তোমার হৃদয় রাজ্য পুড়ে খাক হলে

   আমি থাকবো কোথায় শুনি?


- তবে আমিও পুরো শ্রাবণ তোমাকে দিলাম।

  সামলে রেখো, জলে ডুবে মরি না যেন।

- বেহুলার সামর্থ্য আছে জেনো।


লেবেলসমূহ:

মঙ্গলবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৩

বিরহের কবিতা - ১



১.

ডিমেনশিয়া 

এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

ঝাপসা সে চোখের মায়া, ঝাপসা সে মুখ

তিলগুলো যেন কোথায় কোথায়

মনে পড়েও পড়েই না যেন!


বুকের কোথায় যেন দাগ হয়েছিল

কোথায় যেন বাঁধ ভেঙ্গেছিল

উপর না নীচ কতোটা ফুলেছিল

রক্ত গড়িয়েছিল ঠোঁটের কোন্ কোন থেকেও

সব কিছুই মনে করতে পারি না।


ভদ্রলোকেরা তো জোর করেই ভুলে থাকে

ঐশীগ্রন্থ মাথায় নিয়েও কতো

অবলীলায় নিখুঁত করে মিথ্যে বলে

সচল রাখতে বর্তমান করবেই বা কী!

চারপাশ ঘিরে এতো অস্থিরতায়

প্রায়ই বোধ হারায় মানুষ।


আমি আবার অমন না, এইখানেতেই

অন্যদের চেয়ে চালাক বোধয়

কেমন করে মুঠোফোনের সংখ্যা ভুলেছি

ভুলেছি অসামান্য কতোকিছুর দিনক্ষণ

কেমন করে, কিভাবে যেন, মনে নেই!


আমি একটু কেমন যেন

এক থেকে দশে থাকি না, একেবারেই নিরানব্বই

আর এক হলে একশো হতো

আর এক মিলতে মিলতে মেলেই না শেষে

একদিন নিভে গেলে একশো বিয়োগ একশো

ফের শূণ্য হতো, অথবা প্রকৃতির খেয়ালে

ফের মনু বা আদম হতো।


এখন আমার অনেককিছুই মনে থাকে না

কিছু মানুষ কেনো যে তাও

হঠাৎ হঠাৎ তোমার কথা বলে!



২.

ভালোই আছো

বেশ তো ভালোই আছো

দিন কি রাত রুটিন করে ক্রাশ খাচ্ছো

চার রঙে ছবি ছড়াচ্ছো নেট দুনিয়ায়

রিঅ্যাক্ট আর কমেন্টের মরীচিকায়

মাগজিক শ্রমে ঝড়াচ্ছো ঘাম

নিয়ে ভরপুর ব্যস্ততা।


আধুনিক মানুষিকতা মানুষের চেয়ে

যন্ত্র ভালোবাসে বেশি

কান্না-হাসি-শিৎকারের মতো প্রাকৃতিক

আওয়াজ কি ভঙ্গিতেও আনে আধুনিকতা।


কেমন সেকেলে ভেতর-বাহির নিয়ে

বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দু'পলক তাকাতেও

কেমন যেনো ঠকবাজ লাগে নিজেকে।

চলন্ত ছবির মতো ভেসে ওঠো কেবল

মন বলে ওঠে, তুমিই সুন্দর।


বেশ তো ভালোই আছো,

'ভালো আছো' ভাবতেও ভালো লাগে।



৩.

উড়ো কথা 

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।

মাঝে মাঝেই নাকি আসো এদিকে?

কোথায় কোথায় যাও,

সঙ্গে কে কে থাকে?

রিক্সা পছন্দের বাহন ছিলো,

এখনো কি তাই?

আমার হাত ধরে চিনেছিলে যে শহর

ভোর-বিকেলের স্নিগ্ধ প্রতিবেশ

সকাল-সন্ধ্যার ব্যস্ততা, ভীড়, জ্যাম

ঢিলেঢালা জামার মতো ফ্রি-স্টাইল দুপুর 

নিয়ন আর সোডিয়াম আলোয় মোহনীয় রাত

এখনো তেমনি বরং জমকালো আরো।

তুমিও ঢের সম্পূর্ণ এখন

তাই কখন আসো, কখন যে যাও

বোধয় পাখিরাও জানে না ঠিকঠাক, তবু

ফিরে গেলে শুনি, তুমি এসেছিলে।



৪.

ক্ষোভের গ্রাফিতি

তোমার ছবিগুলোও কথা বলে

মুছে ফেলছি তাই

চৈনিক শিল্পকারিগরের কাটা হাতের

অক্ষমতার অনুভূতিতে বুদ হয়ে থাকি

বারে বারে মনে হয়

এ শহরে তুমি আর নেই!

জোর করে ভুলে থাকি

জ্যামিতিক জীবন, বিগতক্ষণ

ভেতরে তখন, একলা কপোত

আপন মনে কোন্ খেয়ালে

দু'পায়ে মাটি নিঙড়ায়

অক্ষম ক্ষোভে গ্রাফিতি আঁকে!



৫.

দেখা নেই আজকাল

আমাদের দেখা নেই আজকাল

দিনদিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছো

তন্দ্রার ভেতর,স্বপ্নের ভেতর

ঘুরে ফিরে অসম্পূর্ণ চিত্রকল্পই সার!


নিজের সাথে নিজেই বেইমানী করে

তুমি কি দূরে সরে যাচ্ছো?

মাঘের কনকনে বাতাসের মতো

লাগে তোমার কথার ঝাপটা

কেমন অচেনা গন্ধ ঢাকো দামী পারফিউমে

এক সময় তোমার শরীর জুড়ে

থাকতো নির্মোহ সবুজের ঘ্রাণ

ছিল সমানুপাতিক ভালোবাসাময় মন

যে মন বিকাতো না অন্য কোথাও

কোথা থেকে কী হলো আজকাল!


চিলের চোখ নিয়ে ঘুরে টিকটিকি স্বজন

আমাদের আর দেখা নেই আজকাল।



৬.

কোন এক সাবিত্রী কে

শোন্ সাবিত্রী, তুই আসার আগেই 

জেনেছি, 'সত্যবান' বড্ড বেমানান এখন 

আর 'হরিসচন্দ্র' মীরাক্কেলীয় 'নন-ভেজ' 

তবু একগুঁয়ে বুমেরাং মন 

ভিন্ন ভিন্ন পাঠশালায় অভিন্ন পাঠে 

আজ দৃঢ়, আধপোঁড়া, চোঁখা তীর 

অগুন্তি অনুরাগে বোনা সোনালী জালের

মোহ ছেড়ে 

একবার যদি বেরোয় 

শারদ দেবীর কসম, অকাল বোধনেও কিচ্ছু হবে না।



৭.

স্বজন আগুন

সেই যে জেনেবুঝে ধাক্কা দিয়েছিলে

এক গ্রহসম জলজ্যান্ত আগুনে,

পুড়েছি নির্দয়ের মতো শুশ্রুষাহীন

বাধ্য হয়েই শ্রাবণ কি ফাগুনে।


শেষে আগুন এখন স্বজনের মতো

আর সেই আমিটা ফিনিক্স হয়ে উড়ি,

আগুন দেখলে ঝাপ দিই

অবলীলায় আগুন পান করি।


পোড়াই বাহির-ভিতর অকৃত্রিম উল্লাসে 

আক্ষেপ হয়ই না এখন,

ইচ্ছে স্বাধীন এমনিই পুড়ি

পুড়তে ভাল্ লাগে ভীষণ!



৮.

শুনছো কি

আমিও তীর্থের কাকের অপেক্ষা নিয়ে 

ময়ূর পুচ্ছের অগুনিত চোখে

চাতক মনে বসে থাকি,

সময়ের প্রবাহে ঋতু পাল্টায়

আর তুমি যে কোথায়

কোন্ খেয়ালে অবসরের ব্যস্ততায়

আমার দিনলিপিতে পড়ে না চোখ!

ঘুমে কোন্ মেঘের মরীচিকায় আঁকছো হাবিজাবি 

যথেষ্ট হলো না কি?

থিতু হও প্রিয় এ হৃদয়ে

নেড়েচেড়ে দেখো, এখানেও 

অমানিশার পরে জোছনায় ভাসে

ক্ষরার পর প্লাবনে সিক্ত হয়

শিশির বিন্দু হিরণ্ময় দ্যুতি ছড়ায়

পাখির আবাহনে বসন্ত বয় তবু

কোন্ মোহের ঘুমে কাতর থাকো?

জেগে ওঠো প্রিয়, দেখো

সত্ত্বাধিকারী বিহীন হৃদয় প্রকোষ্ঠের অনন্য স্থান 

ধূপ ধোঁয়ায় মেঘের রাজ্যপাট এঁকেছে!

মোহের ঘুম ছেড়ে উঠে এসো 

উঠে এসো প্রিয়, 

ডাকছি ভীষণ, শুনছো কি?



৯.

বিবাদী

বেঁচে থাকার কমছে বয়স এখন

জমছে মেদ এদিক ওদিক

টান্ হারাচ্ছে ত্বক

টানছে হাত প্রসাধনীর বিজ্ঞাপন।


টাটায় খুব চোখ দুটিতে

গর্ত হচ্ছে দাঁতে

কালি জমছে ফুসফুসে

হৃদপিণ্ডে বাড়ছে বর্জ্য আয়েশে

পাকস্থলি অনিয়মের ভাগারে

যাপিত জীবন খেয়ালের রথে চড়ে

কসরতহীন অঙ্গাদি ডেকে ডেকে

বাধ্যতামূলক করছে ঔষধকে।


আক্ষেপ এভাবে পেড়িয়ে যাওয়ায়

রাখিস্ না যে খবর

বুকের চিনচিনিয়ে ব্যাথায়

বিবাদীর নাম কিন্তু তোর।



১০.

ঊনপঞ্চাশ বায়ু

পুকুর ভালোবাসলো এক শঙ্খচিলকে। এক গ্রীষ্মে সে সমুদ্র পেরুতে গিয়ে ঝরের কবলে পড়ে কোথায় যে মিলিয়ে গেল কেউ জানে না! সেইথেকে পুকুরের সমুদ্র ছোঁবার বাসনা। কি কি করে একদিন নিমন্ত্রণ করে আনলো এক ইঁদুরের পাল। ইঁদুরেরা গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে থামলো। সেবারই বর্ষায় গর্ত দিয়ে পুকুর গিয়ে নদীতে মিশলো। তারপর ছুটলো সমুদ্রের দিকে। মোহনায় গিয়ে খবর পেল, সমুদ্রের সেই জলেরা উবে গিয়ে হিমালয় ঢেকেছে। সূর্যের অনুগ্রহে সেও উবে হিমালয়ে গিয়ে দেখে, হিমালয় ঢেকে দেয়া সেই বরফের দল গলে গলে অসংখ্য ছরার সমাহারে নদী হয়ে ছুটছে সমুদ্রের পানে।

সেও ছোটে কখনো নদী থেকে মোহনা, মোহনা থেকে সমুদ্র, সমুদ্র থেকে হিমালয়। তবু আর ছোঁয়া হয় না। শেষমেষ প্রত্যাবর্তন স্বস্থানে। দিনরাত্রি তার বুকে ভাসে নক্ষত্রেরা, খেলা করে রোদ্দুর, জোছনা, ডুব দিয়ে যায় কতোকিছু; শুধু ...। 



১১.

ব্যস্ততা

ইষ্কাপনের বিবি'র ভাব তোমার শরীর জুড়ে

তবু তোমার কাছে গিয়ে বারংবার 

খুবকরে সুখ ভরে নিতে ইচ্ছে করে।

অথচ কী সাংঘাতিক ব্যস্ততা তোমার!


আহা! ব্যস্ততা, নিপুণ ঘাতক ব্যস্ততা 

আমাকে ভুলিয়ে দেয়া ব্যস্ততা,

জয়ের পতাকা তোমার মধ্য দুপুর

কি রাতেও পত্ পত্ করে ওড়ে!


ব্যস্ততাহীন বন্ধ ঘড়ি আমার হাতে

তোমার বিরামহীন! 

হায় ব্যস্ততা! তোমার আবরণে ঢেকে

আমি হই শেষ শয়ানে কমরেড।



১২.

প্রতিশোধের শব্দেরা

‌তোমার হৃদ‌য়ে পরগাছার স্থায়ী ব‌ন্দোবস্থের 

বায়বীয় দ‌লিল মা‌ড়ি‌য়ে 

অনুগ্রহতুল্য বিকলাঙ্গ অথবা খুন ক‌রে 

‌বিদায় নেব সব থে‌কে 

পাপী দে‌হের পা‌শে 

প‌ড়ে থাক‌বে জবানবন্দী 

প্রণয় বেড়ুবে গোপন বেডরুম কালচার ছেড়ে

‌কিছু মানুষ শুধ‌রে নে‌বে নি‌জে‌দের 

সাদা ফু‌লের গ‌ন্ধে শো‌ভিত পৃ‌থিবী  

তখন আ‌মি অথবা আমরা বিহীন ।



১৩.

নিখোঁজ 

তারপর তার আর খোঁজ নেই 

কত পূর্ণিমায় সরীসৃপেরা সঙ্গমে মাতলো

কাকের বাসায় কত ছানা ফুটলো কোকিলের

কত বর্ষার অলস সময়ের ভালোবাসা জানান দিতে 

গ্রীষ্মে চোখ মেললো কত মানব শিশু 

কত ফুল ঝরে গিয়েও

মধুর পাত্রে রেখেছে তার অস্তিত্ব 

তবু খোঁজ মেলেনি তার 

কারণে-অকারণে খুঁজছি কতই

খোঁজ মিলছেই না কিছুতে

তবু কেন যে লোকে বলে,

খুঁজলে নাকি মেলে। অথচ

সেই মনের অভিব্যক্তি দেখা হচ্ছেই না আর!



১৪.

শাশ্বত বর্তমান

তোর স্মৃতিচিহ্নের মতো কষ্টগুলো

ড্রয়্যারে তালা এঁটে

দিব্বি উড়িয়ে দিই সময়।

ড্রয়্যার ফেটে ফুল কি কীট

বেরুলে বেরুক, ভাবি না।

অতীত বা ভবিষ্যতের জন্যও না।

প্রতি মূহুর্তে অতীত হয়ে যাওয়া

বর্তমান নিয়েই বাঁচি।


লেবেলসমূহ:

রবিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৩

বিরহের কবিতা - ২




১.

বান্ধই

আইজ কাইল সারাদিন আমার ঘুম পায়

তবুও ঘুম আসে না রে বান্ধই

ছুডু ছুডু খোয়াবে ভইরা থাকে দুইচোখ 

পুরাণা দিনের স্মৃতির ছন্দে-গন্ধে অনাগত দিনের

গোপন খুনসুটি মিইশা হেই এক রাজভোগ যেন!

খোয়াবের রাজ্যে অহন আমি নিত্য বাসিন্দা। 


তাও আমার ভাল্ লাগে! 

অজানা এক তৃপ্তিতে জুরাইয়া যায় শইল-মন

আমি সুখের আনন্দে চিল্লান দিয়া উঠি

চোক্ষে ভাসে ঝিলমিইল্লা কতো বাতি

হুশ থাকে না গো আমার

সব ঢাইলা দিতে মন চায়!


আবার খারাপও লাগে!

বুকের ভিতরে আউলা বাতাস ঘুরতে ঘুরতে

আষাঢ় মাসের বান ডাকে

আমারে খালি ভাসাইয়া লইয়া যায়

আর নিঃস্ব বানাইয়া দেয়

অস্থির লাগে আমার!


আমার খুব ঘুমাইতে মন চায়

তবু ঘুম আসে না গো।

বেহেই কয়, আমি বেধুম ঘুমাই

তুমিও তাই শুইনা হয়ত মনে মনে গাইল পারো!

আমি কি আর ঘুমাইরে বান্ধই

চোখ বুঁইজা পইড়া থাকি কেবল।



২.

পণ

ওপারে তুই বেঁধেছিস ঘর

ঢেলে দিয়ে স্বপ্ন ঝুড়ি,

সময় কাটে নিথর আমার 

সুখ যে সুতো কাটা ঘুড়ি।


মাঝখানে তরল আগুন

পেড়ুই নিয়ে ফুটো নৌকো,

ড্যাম সিগারেটে মুখ কাহিল

টানের পর টান তবু শেষ হয় নাকো।


ভুলতে চাই, পাষাণ তোকে ভুলতে চাই 

তাই পেড়িয়েছি সাতটা সাগর

বুকে চেপে অনেক পাথর 

চতুর প্রিয়, তোকে ভুলতে চাই।


হঠাৎ হঠাৎ তবু মন কেমন কেমন!

আজও বুঝি তোকে চাই ভীষণ। 

এই-যা! কি বলছি ধুর ছাই!

চতুর-পাষাণ, তোকে ভুলতেই চাই।



৩.

সাম্প্রতিক 

ড্রোনের চোখে তাকানোই যায় না 

পার্শ্ববর্তী দেশগুলো খোঁজা শেষ,

অবিরাম খুঁজে হয়রান

প্রিয় তুমিটা নিরুদ্দেশ!


বিষিয়ে বায়ু, পুড়িয়ে সবুজ 

কালোয় ঢাকে কত রঙ,

প্রজাপতি উড়ে নাচে দেখি

দোয়েলের কন্ঠেও সরকারি ঢঙ।


আমারও বিচ্ছিরি লাগে রাতদিন 

বুঝি চরম নিয়তি এই,

জীবন বিষাদের কফি মগে 

তুমি নামক মিষ্টিটা নেই।



৪.

বাস্তবতা 

আপাত নিখাদ অভিনয়ে পেড়ুলো তো অনেকটা সময়

এখন সহজাত ইচ্ছের মতোই যাপিত জীবন

তোমার জন্য দুঃখবোধ এখন শূণ্যের ঘরে

বরং কবিতার শরীর হয়ে উঠতে পারতো

এমন বিস্মৃত অগ্রন্থিত শব্দগুচ্ছরা

সেদিনের চেয়ে হাহাকার জাগায় বড়।


এখন কোন্ আকাশে জ্বলজ্বল হয়ে ঝুলে থাকো

কোন্ বাতাসে ওড়াও মন

কোন্ ঢেউয়ে ভাসাও শরীর

কার সঙ্গে ভাগ করে আনবে আগামী

এইসব গোপন জিজ্ঞাসারা উকি মারে না।

কাটুক সময় তোমার ইচ্ছে মতো।


বেহিসেবি মন হঠাৎ যখন হিসেবি হয় জাগতিক মোহে

ডেবিট-ক্রেডিট-ব্যালেন্স নির্ভুল হওয়াই সঙ্গত

আর আমি হিসেব নিকেষের কানে তুড়ি মেরে

দিব্বি আছি আমার মতো

এখন আর মনে না করিয়ে দিলে

তোমার অস্তিত্ব মনেও আসে না প্রিয়!



৫.

বেদনার রুপ

সমৃদ্ধ ফোনবুক ভরে আছে নাম্বারে

অপারেটরের ক্ষুদে বার্তায় উপচে থাকে

প্রেরিত বার্তার ঘর করে উপহাস;

আমার আলসেমী এখন এমনি।


আমাকে নাকি খুঁজেই পাওয়া যায় না!

লোকমুখে জেনেছো নিশ্চই?

তাই নাড়োনি বুঝি আঙ্গুল

অথচ যোগাযোগ নেই কতোদিন!


যদিও কথাতো এমনি ছিলো হে সুন্দর 

সব মোহ ছেড়ে

বৃক্ষের মতো আমার ইন্দ্রীয় কেবল

তোমার সংকেতের অপেক্ষায় ধ্যানমগ্ন থাকবে

ঘড়ি, ক্যালেন্ডার হিসেব না করে!


জমকালো স্মৃতিতে ঘেরা জীবন

এমনি দীর্ঘ যোগাযোগহীনতায়

কি এসে গেছে আমাদের! 

তুমি কি আর জানো প্রিয় 

আমার বেদনাও কতো সুন্দর!



৬.

ইকারাস

ইথারে এতো যে কথা ভাসিয়ে দিই 

শুনতে কি পাও তুমি?

মনের কানে ধরা দেয় কি তার কিছু? 

হলে ভালো, না হলেও কার বা কি ক্ষতি! 

উড়ে যাওয়া শিমুল তুলো আর

কার মাথায় বসতে পারে

ঝরা পাতার শব্দের মতো

শিশির বিন্দু পতনের মত

হৃদয়ের ক্ষরণে শব্দের জন্ম হয়

মনের আকুতি ভেসে যায় কেবল

শোনো কি?

আমি বুঝি তারার থেকেও দূরের মানুষ?

আমার দহন বুঝতে তোমার 

জন্ম-জন্মান্তর কেটে যাচ্ছে!

আমি বুঝি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কেউ?



৭.

আশাবাদ 

হয়তো ফিরবে না

তারপরও যদি ফেরো!

যতই উদ্ধত থাক নাগ-নাগিনীর ফনা

যতই ব্যারিকেডের স্তূপ পড়ুক

গনতন্ত্রের মুখোস আটা চলমান

স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার যুগেও

যেমন সাম্যবাদের স্বপ্ন লালন করি

তেমনি কল্পনার বিলাসিতা আবারও

বারবার নিজেকে বোঝ মানানো

যদিই ফেরো!

হয়তো ফিরবেই না

তারপরও যদিই ফেরো!



৮.

আবার মুখোমুখি 

এক কোটি বছর কি হয়ে গেছে-

আমাদের যোগাযোগ নেই!

ঘূর্ণন সূত্রের দীর্ঘ সমীকরণে

শনি-বৃহস্পতির অক্ষমতা-সক্ষমতায়

কালই হয়তো মুখোমুখি এক মঞ্চে।

জোর করেই মন পাখিকে

যেসব বুলি পড়ালে এতকাল 

রপ্ত হয়েছে তো?

নতুন আকিকায় ভুলেছে তো গোপন নাম?

লকারে জমা রাখা মূ্ল্যবান অলংকার

গিলেছে তো পুরোনো সব প্রতিজ্ঞা? 

জীবনে কত ভাবেই বেঁচে থাকা যায়! 

ভাবনার শিমুল তুলোরা ভাসতে ভাসতে

সবে উড়োউড়ির বিজ্ঞান বুঝতে চেয়েছিল

আর অমনি কালো মেঘের ঝুম বৃষ্টি

জল গড়ালো কেবল আমাদের দু’ভাগ করে।

ভাবনার পতন হলেও এখনও কী সুন্দর!

আজকের দিন পরই হয়তো মুখোমুখি

তুমি-আমি মুদ্রার মতো দুই রুপ নিয়ে;

সে অব্দি পৃথিবী বেঁচে থাক।



৯.

তুমি-আমি ও কবিতা 

অন্তত একটি কবিতার সুবাদে 

আপাত অমরত্ব পেয়ে যাবো দেখো।

তোমার নিতান্তই অযোগ্য হয়েও

একদিন জ্বলজ্বল করবো তোমার চেয়ে।

একান্তই তোমার জন্যে লেখা পঙক্তিরা যখন

নানান কন্ঠে উচ্চারিত হবে প্রেমাস্পদের বন্দনায়

তুমি কান চেপে ধরলেও জাগবে মনে

মন থেকে মুছতে চাইলে বাজবে কানে

নিরুপায় অস্বস্তিতে ভুগবেই ভীষণ 

অপ্রতিরোধ্য আমার কথার আবর্তনে!

অসঙ্গত চাওয়া পাওয়ার এ জীবনে

অন্তত একটি কবিতার জন্ম ও দীর্ঘায়ু 

নিশ্চিত করেই জীবন ছাড়বো জেনো।



১০.

আকুতি 

যেন নিশীথ হীম-কুয়াশায় বিজন গাছে 

বাদুরের মতো আছি ঘাপটি মেরে

তবু মনের ভেতর শীতনিদ্রা ভুলে 

ডেকে ওঠে বর্ণচোরা তক্ষক।

সময়ের কাঁটা আচঁড় কেটে আঁকে জাল

গতির কাঁচি ধার নিয়ে যুদ্ধ করে।

অনীহায় সূর্যালোক হারালে 

মেঘ তাড়িয়ে দৃশ্যমান করে চাঁদ,

স্নিগ্ধ মায়াবী আলোয় রাত ভাসে

ভাসে চাঁদ চোখে

ভাসে জলের ওপর 

আমি ছুঁতে যাই

চাঁদ কেঁপে কেঁপে হারায়।

আমি জোছনা মেখেও দিব্যি 

আর জোছনাই জানি

মহিমান্বিত করে কলঙ্কিত চাঁদ,

কেন যে তবু ছুঁতে চাই

কেন যে মিছে পেতে চাই

বাসি বকুলের ঘ্রাণ মেখে কেন যে 

নিরুত্তাপ চাঁদের আলোতেও ঝলসে যাই!

জানি না, জানিই না তবুতো জানি

জীবনই সুন্দরের উপমা।

বিস্মৃত করে নিকট অতীত

ফাগুন আমায় রাঙাও ফের।



১১.

মুক্তি 

হাতে থেকেও ফসকে যাওয়া কপাল

সময় হারিয়ে সময় হওয়া হাত

পায় না খুঁজে সেই কথা দেয়া-নেয়া মন

আহা কাতর জীবন, কত যে যাচে-মাগে

করুণাও পায় না তবু!

'ক্ষমা করো'

'ভুলে যাও'

'ভালো থাকো'

আরও কত যে আকুতি মাখা আবেদন! 

নীল-কালোয় মাখামাখি আহা জীবন,

মরে যা

ধ্বংস হ'

বিস্মৃতির কূপে হারা;

মুক্তি মিলুক তোর 

মুক্তি মিলুক তার।



১২.

কোয়ারেন্টিন যাতনা

তুমি বন্দীদশায় একাকী ঘরে

কাটাচ্ছ সময় তাও কমবেশি অসুস্থতায়।

আমার চুপসে থাকা পকেট

খাটো হাত, মানুষটাও তাই আর

সীমাহীন অক্ষমতা সয়ে যাওয়া জীবনে

এই মুহূর্তে আরকিছু পারি বা না পারি

তোমাকে না বলা কত কত কথা কিংবা

বলে ফেলা কথাগুলোও তো আবার

শোনাতে পারতাম স্মৃতির ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে।

তারপর, শ্লেষ্মা জমা কন্ঠে কবিতা

তাও আবার তোমাকে নিয়ে লেখা

কিংবা অন্যকিছু নিয়ে অথবা

অন্যকোন কবির কবিতা হতে পারত,

হতে পারত আমাদের আরো আরো কথা,

তোমার কিছু উদাম বেফাঁস কথার মেলা

আর আমার হাসিতে লুটিয়ে পড়া।

এখনতো সাথে তোমার ডিটেকটিভ মা নেই

একটি চিলে কোঠার সুবাদে

আমারো সম্প্রতি মুক্তি মিলেছে

বাবার অতি কেয়ারিংয়ের চোখ থেকে।

পরস্পরের হাতের নাগালের বাইরে

চোখের নাগালের বাইরে আমরা,

বাইরে বাকিসব বাঁকা চোখের নাগালের

এই সময়টা একান্ত আমাদের হতে পারতো।



লেবেলসমূহ: